ধর্মীয় সংহতি বজায় রাখলে হ্রাস পাবে দেশের দ্বন্দ্ব-কলহ
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের জেরে সংঘাত ও হিংসা ছড়িয়ে পড়ছে। তাই প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ধর্ম পালনে সহনশীল হওয়া প্রয়োজন। পরিবার থেকেই সদস্যদের অন্যান্য ধর্মের প্রতি সম্মানশীল হতে শেখাতে হবে। কারণ, ধর্মীয় সংহতি বজায় রাখতে পারলে দেশে বিরোধ-বিবাদ অনেকটাই কমে যাবে।
এই বিষয়টি ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি-বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে উঠে এসেছে। এটি আয়োজন করেছে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট ও মাল্টি-স্টেকহোল্ডার ইনিশিয়েটিভ ফর পিস অ্যান্ড স্ট্যাবিলিটি (এমআইপিএস)। গত শনিবার রাজধানীর গুলশানে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্মের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সংলাপে জানানো হয়, দেশের 30টি জেলার 80টি উপজেলা এমআইপিএস কার্যক্রমের আওতাভুক্ত হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির শুরু 2023 সালে। এর উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে ঘটা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত সহিংসতাকে চিহ্নিত করা এবং সেসব প্রতিহত, প্রশমন ও দমন করা। এ ছাড়া, সহনশীলতা বাড়ানো এবং সবার মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্যকে সুদৃঢ় করা।
ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, “জুলাই বিপ্লবের পর সবার যে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন, সেটির জন্য প্রয়োজন সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ। প্রত্যেকেরই যেমন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রয়েছে; তেমনই রয়েছে ধর্ম পালনেরও অধিকার। যারা উপাসনালয়ে হামলা চালায়, তাদের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই। তারা অপরাধী। ধর্ম পালনে কাউকে বাধা দিতে দেওয়া হবে না।” তিনি আরো বলেন, “ধর্মীয় সংহতি বজায় রাখতে পারলে সংঘাত-কলহ অনেকটাই কমে যাবে।”
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও স্বাগত বক্তব্য দেন দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, “ধর্মীয় পার্থক্য ভুলে সবাইকে মিলে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ থেকে বিরত থাকতে হবে। এর ফলে কেউই নিরাপদ থাকতে পারবে না। সবার মধ্যে এই উপলব্ধিটা তৈরি করতে হবে।”
সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা ‘বাংলাদেশের ধর্ম ও সংস্কৃতি: ঐতিহ্য, সংকট ও করণীয়’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধে বলা হয়, “বর্তমানে বিশ্বে ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানো ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানোর ঘটনা ঘটলেও, এমন অনেক মানুষও রয়েছেন যারা ধর্মের নামে মানবতার কল্যাণে নিজেদের অর্থ ও শ্রম দিচ্ছেন। কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই বিষয়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি করা সম্ভব। এর জন্য ‘নৈতিক শিক্ষা’ বইয়ে অন্য ধর্মের মৌলিক কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি অধ্যায় যুক্ত করা যেতে পারে।”
মুক্ত আলোচনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুহাম্মদ রফিক-উল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে। তবে কোনো কোনো স্থানে পবিত্র কোরআন অবমাননা এবং মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে এমন সাম্প্রদায়িক হিংসা সামনে আনা হয়।”
বাংলাদেশ বৌদ্ধ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় ধর্ম নিয়ে হানাহানি না করে মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “এদেশে আমরা সবাই মানুষ। আমরা এক জাতি। আমাদের ভাষাও এক। আর ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যাপার।”
পরিশেষে, অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতির সভাপতি হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ও টালিথাকুমি চার্চের বিশপ ফিলিপ পি অধিকারী।