• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০২:৫৬ অপরাহ্ন |

সুবাসী শিরীষের রেশমাল পাপড়ি

সুগন্ধময় শিরীষ ফুল

আমরা অনেকেই "শিরীষ" বলতে "কড়ই" গাছ বুঝি। তবে, প্রতিটি কড়ই গাছেরই নিজস্ব একটি পরিচয় রয়েছে। যেমন: সাদা কড়ই, শীল কড়ই, চট্টগ্রাম কড়ই বা মটর কড়ই ইত্যাদি। এই তালিকায় আমরা গগনশিরীষও যোগ করতে পারি। এই শিরীষের মধ্যে, "মেঘশিরীষ" আঞ্চলিকভাবে "রেন্ডিকড়ই" নামে পরিচিত।

আমাদের দেশে অন্য শিরীষের তুলনায় মেঘশিরীষই সংখ্যায় বেশি। এতগুলো শিরীষের ভিড়েও একটা গাছ কেবল "শিরীষ" নামেই পরিচিত। এই শিরীষটি বিশেষভাবে এর সুগন্ধি ফুলের জন্য বিখ্যাত। ফোটার সময় এই ফুলের তীব্র সুগন্ধ অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে পড়ে। এই গাছটি প্রায় পুরো দেশেই দেখা যায়। ঢাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া স্বল্প সংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে এই শিরীষ অন্যতম। অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই গাছ ঢাকায় একসময় অনেক বেশি ছিল। এখন তা কমে গেছে।

প্রকৃতি এবং বিজ্ঞান লেখক দ্বিজেন শর্মা তার "শ্যামলী নিসর্গ" গ্রন্থে লিখেছেন, "শিরীষ ফুলের সৌন্দর্য সম্পর্কে এদেশের কবিদের সচেতনতা খুবই পুরনো।" কালিদাস তাঁর মেঘদূতে শিরীষকে চারুকর্ণের অলঙ্কার বলে উল্লেখ করেছেন (চারুকর্ণে শিরীষং)। বৈষ্ণব কবি রাধামোহনের কাছে শিরীষ কোমলতার প্রতীক, তাই তিনি লিখেছেন, "শিরীষ কুসুম জিনি কোমল পদতল।" আর রবীন্দ্রনাথ তো প্রশংসায় অসম্ভব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন। ফাগুনের শিরীষের প্রস্ফুটনে এত সৌন্দর্য তিনি না পেলে তেমন উচ্ছ্বাসে এই কথাগুলো বলতে পারতেন না: "প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায় ফাগুন মাসে/ কী উচ্ছ্বাসে/ ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর খেলা।"

চৈত্রের শেষের দিকে দু’এক পশলা বৃষ্টি হলে শিরীষ ফুল ফুটতে শুরু করে। গ্রীষ্মকাল পেরিয়ে শরতের প্রায় শেষের দিকেও কিছু কিছু গাছে ফুল থাকে। শীতে পাতা ঝরে গিয়ে বিবর্ণ হয়ে দাঁড়ানো গাছে চওড়া এবং লম্বাটে শিমের মতো ফলগুলো ঝুলতে থাকে। এই সময়, মৃদু বাতাসে ফলগুলো ঝনঝন শব্দ তোলে।

ফোটা শিরীষ (Albizia lebbeck) মাঝারি আকারের একটি গাছ। এর কাণ্ড সরল, উন্নত, গোলাকার, লম্বা, পুরু বা সাদা এবং প্রায় মসৃণ। এর চূড়া ছাতার মতো এবং ঘন পাতার বিন্যাস ছায়া ঘন করে তোলে। এর পাতা দুই ভাগে ভাগ করা এবং আলো সংবেদনশীল, তাই সন্ধ্যায় ভাঁজ হয়ে যায়। মঞ্জরির আকৃতি মেঘশিরীষের মতো হলেও আকারে বড় এবং রঙেও আলাদা। ফুলের সৌন্দর্য প্রধানত ফোটা পরাগ এবং কেশরেই দৃশ্যমান। সরু পাপড়িগুলোর কোমলতা পালকের মতো। শিরীষ-মঞ্জরি হালকা হলুদ এবং পরাগকেশরের আগা সবুজ।

এই গাছের ছাল, পাতা, ফুল, বীজ এবং কাঠের সারাংশ ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে। শরত্কালে ছাল, বসন্তে পাতা, বর্ষায় ফুল এবং বসন্তের শুরুতে ওষুধের জন্য বীজ সংগ্রহ করতে হয়। বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারিতে ৭টি ওষুধ তৈরিতে শিরীষের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। পরিমাপ মতো পাতার রস পান করলে এবং চোখে দিলে রাতকানা রোগ সেরে যায়। বীজের গুঁড়ো মিশ্রি এবং গরম দুধের সঙ্গে খেলে শারীরিক শক্তি বাড়ে। চোখ ওঠার রোগে বীজের অঞ্জন এবং পাতার রস বেশ উপকারী। ফুল পেস্ট করে পোড়া জায়গায় প্রলেপ দেওয়া ভালো। বিষাক্ত পোকা বা ইঁদুরের কামড়ে ক্ষতস্থানে ছাল পেস্ট করে লাগালে এবং ছালের রস পান করলে উপকার পাওয়া যায়। ছালের গুঁড়ো দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত এবং মাড়ি শক্ত হয়। শিরীষের শিকড় অরেচক এবং ছাল বিভিন্ন চর্মরোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। শিরীষের কাঠ শক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী। শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার এবং চীনেও এই গাছ জন্মায়।

মোকারম হোসেন
প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *