• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন |

সাহসের প্রথম রাতের গল্প

১৬ জুলাই সকালে ডাক্তার তাসনীম সিদ্দিকী (রিয়া আপা) ফোন করে জানান, আমাকে গ্রেপ্তার করার গুঞ্জন ছড়িয়েছে। তিনি রাতে তাদের বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এর আগে সাইয়েদ আব্দুল্লাহ, আমার সহকর্মী সুমাইয়া খায়ের ও অন্যরা আমাকে গ্রেপ্তার হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন।

তাদের আশঙ্কা অমূলক ছিল না। কোটা সংস্কার আন্দোলন দমাতে আওয়ামী লীগ, পুলিশ, উচ্চ আদালত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসী নীতির কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বিস্ফোরক হয়ে উঠছিল। ১৫ জুলাই প্রায় সারা দিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ পেটোয়া বাহিনী একতরফা হামলা চালায়। সেদিনই ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উল্টো অভিযোগ করেন যে ফরহাদ মজহার ও আমি শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। অথচ সেই পর্যন্ত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নেতাদের সঙ্গে আমার কোনো আলোচনাও হয়নি। আমি শুধুমাত্র পত্রিকায় লেখালেখি (প্রথম আলো ও মানবজমিন) এবং টক শোতে অংশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের পক্ষে কথা বলেছি।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমার এই অবস্থান নতুন কিছু ছিল না। ২০১৩ সালে এ ব্যাপারে আমি প্রথম লিখেছিলাম, ২০১৮ সালেও এই আন্দোলনের সময় কয়েকবার এর পক্ষে কথা বলেছি। তখন আমার গ্রেপ্তার হওয়ার সম্ভাবনা কেউ জোরালো করে বলেননি, এখন হঠাৎ কেন বলছেন! ২০২৪ সালের এই আন্দোলন কি সরকারের জন্য এমনই আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে!

১৫ তারিখ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রাস্তায় নামতে না পেরে আমি খুব হতাশ হয়েছিলাম। রাতে একা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে যাই। জরুরি বিভাগে রক্তাক্ত হাত-পা, মুখ নিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তারা। কারও অপারেশন করার প্রস্তুতি চলছে। আশপাশে উদ্বিগ্ন বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজন। এই আহত শিক্ষার্থীদের নাকি আবার হামলার জন্য কয়েক দফা হাসপাতালে প্রবেশের চেষ্টা করেছে ছাত্রলীগ। আনসাররা জানালেন, বাধা দেওয়ার সময় তাদের মারধর করা হয়েছে। হামলার ভয়ে অনেককে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্য চিকিৎসালয়ে।

হাসপাতালের দোতলায়ও কয়েকজন ভর্তি রয়েছেন। তাদের দেখে নামার সময় প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ হয় নাহিদের সঙ্গে। এমন একটা শান্ত-সুবোধ চেহারার ছেলে এত বড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, ভাবা যায় না। হন্তদন্ত হয়ে সে বের হয়ে যাচ্ছিল, আমার জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলল। কয়েকজন সঙ্গী তাকে তাড়া দিচ্ছিল। রাতে নাকি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে তারা।

রাতে বাড়ি ফিরে কিছুতেই অস্থির লাগছিল। শাহদীন মালিক, বদিউল আলম মজুমদার, মাহবুব মোর্শেদসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি। ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ছাত্রদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও সরকারের কাছে সমাবেশ এবং একটা বিবৃতি দেওয়ার দাবি জানাই।

১৬ তারিখ দিনভর আসতে থাকে ১৫ তারিখ ও পরদিন আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের গুন্ডা বাহিনীর রড, ধারালো অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে নির্বিচার হামলার এবং কয়েকজনের মৃত্যুর খবর। বিধ্বস্ত মনে রাতের মধ্যেই বিবৃতি লিখে পত্রিকাগুলোয় পাঠিয়ে দেই। ১১৪ জনের স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে ছাত্রদের হত্যা ও হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়, ছাত্রলীগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি করা হয় এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে সমাজের অনেক বিশিষ্ট নাগরিকের অংশগ্রহণ ছিল। তাদের মধ্যে এমনও ছিলেন, যারা সাধারণত সরকারের বিরুদ্ধে কড়া বিবৃতি দিতে অনীহ প্রকাশ করেন। সেদিন কেউ আপত্তি করেননি। কিন্তু বিবৃতি পাঠিয়েও মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমাদের সন্তানদের এভাবে মার খাচ্ছে! বিবৃতি নয়, শিক্ষক হিসেবে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে, বিশেষ করে অভিভাবক হিসেবে।

গভীর রাতে ১৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী শিক্ষক সমাজের ব্যানারে কর্মসূচির বার্তা পাই মেসেঞ্জারে। সেদিন সকাল ১০টার দিকে অধ্যাপক আমানুল্লাহ ফেরদৌস, আমিনুল ইসলাম তালুকদারসহ কয়েকজন শিক্ষক ফোন করে জানান, সমাবেশ শুরু হয়েছে। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গিয়ে দেখি শিক্ষকেরা ব্যানার তুলে দাঁড়িয়েছেন। শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্যরা ও বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের একটা বিশাল অংশ ছিল সেখানে, ছিলেন সমাজের নানা পেশার মানুষ। একটু দেরিতে হলেও এমন কর্মসূচি হচ্ছে দেখে মনের মধ্যে চেপে থাকা গ্লানিবোধ কিছুটা দূর হলো। এর মধ্যে আন্দোলনে আওয়ামী লীগের গুন্ডা বাহিনীর হামলার কিছু ভিডিও আর ছবি ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে। এস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *