ছোটবেলা থেকেই আমি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরেই নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলমের মতো আরও কয়েকজনের সাথে রাজনৈতিক মহলে আমার পরিচয় হয়। এরপর গুরুবার আড্ডায় রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ শুরু করি। লক্ষ্য ছিল নতুন রাজনীতি নির্মাণের জন্য রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি করা। ধীরে ধীরে গুরুবার থেকে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি গড়ে ওঠে।
5 জুন যখন কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় আসে, সেদিন সন্ধ্যায় আন্দোলন শুরু হয়। 5, 6 এবং 9 জুন আমরা আন্দোলনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত করি। 9 থেকে 30 জুনের মধ্যে পরিপত্র বহালের জন্য আলটিমেটাম দেওয়া হয়। পুরো আন্দোলনের নেপথ্যে এই 21 দিনের আলটিমেটামটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মূলত এই সময়ের ঈদের ছুটিতে দেশব্যাপী আন্দোলন সংগঠিত করা হয়।
9 জুন রাতে রিফাত রশীদ ও হাসিবুল ইসলামকে নিয়ে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করি। সে রাতে যেসব বিষয় মাথায় নিয়ে আমরা আমাদের ‘আর্ট অব মুভমেন্ট’ সাজিয়েছিলাম, পরে আন্দোলন সেই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই জোরদার হয়। এসময় ফেসবুক গ্রুপ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে থাকি। ঢাকার বাইরে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য 5-7 জনের একটি দল গঠন করা হয়েছিল। এই দলটির নেতৃত্ব আমার ওপর ছিল। 16 জুলাই পর্যন্ত দেশের যেসব স্থানে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, প্রায় প্রতিটিতেই আমি যুক্ত ছিলাম। সেই সময়ই 13 জুন আবু সাঈদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।
মাঠে মানুষকে সংগঠিত করা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল আমাকে। এ ক্ষেত্রে সান জুর লিখিত ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ নামক বইটি মাঠ রাজনীতিতে কৌশল সাজানোর ক্ষেত্রে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমি ভূতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র হওয়ায় বাংলাদেশের ভূগোল নিয়ে আমার জ্ঞান ছিল। পাশাপাশি সান জুরের কিছু ধারণা, কৌশল এবং মাঠের বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হত। বাংলা ব্লকেডের সময় কোন কোন স্থানে ব্লকেড হবে, সেগুলো আমি ঠিক করতাম। সবকিছু খুব সাবধানে বিবেচনা করে এমনভাবে স্থান নির্বাচন করা হত যাতে সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যায়। আন্দোলনের পয়েন্টগুলো আগে থেকেই ফেসবুক এবং গণমাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হত।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথম গুলি চলে 11 জুলাই। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাত 11টা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। ঘটনার আগের দিন তাদের সঙ্গে আমার অনলাইনে একটি সভা হয় এবং তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে পরের দিন তাদের উপর হামলা করা হতে পারে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু কৌশল ঠিক করি।
13 জুলাই সন্ধ্যায় আমার ভাতিজা ব্লাড ক্যানসারে মারা যায়। রাতে জানাজার উদ্দেশ্যে কুমিল্লা রওনা হই। 14 জুলাই সকালে জানাজা শেষে ফ্রিজিং ভ্যানে করে ঢাকায় ফিরি। সেদিন ‘মার্চ টু বঙ্গভবন’ কর্মসূচিতে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা ছিল। ঢাকায় এসে দেখি, মিছিলটি গুলিস্তান জিপিওর কাছে। স্টেডিয়াম মোড়ে ব্যারিকেড দিয়েছে পুলিশ; জিপিও এবং পুলিশি ব্যারিকেডের মাঝখানে কিছু গাড়ি ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়েছে, যাতে মিছিলটি সামনে আসতে বাধা পায়। কিন্তু পুলিশ চাইলে সেদিন গাড়িগুলো সরিয়ে নিতে পারত, তা না করে তারা বরং শান্তিপূর্ণ মিছিলটি বাধাগ্রস্ত করে।
আমার মনে হয়েছিল, পুলিশ চাইছে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা বাস এবং গাড়িতে আঘাত করে তাদের ফাঁদে পা দেয়। কিন্তু আমরা তা হতে দিইনি। যারা যারা মাইকের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা দৌড়ে গিয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। ফলে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিটি শেষ হয়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেদিন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে সম্বোধন করেন। এই কথাটি আমাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে।
তখন আমি চানখাঁরপুলের একটি বাসায় ছিলাম। সেদিন লুৎফর রহমান নামে এক বড় ভাইকে বললাম, ‘ভাই, আমার কাছে মাত্র 10 টাকা আছে। 500 টাকা দেন, ফেস্টুন বানাতে হবে।’ তিনি বললেন, তাঁর কাছে খুব বেশি টাকা নেই। তখন বললাম, ‘আপনি 500 টাকা দিলে হাসিনাকে ফেলে দেব। আর না দিলে পড়বে না।’ তিনি 1000 টাকা বের করে দিলেন। এ সময় সামনে নাহিদ ভাইও ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে মাত্র 50-60 টাকা আছে। আমাকে 500 দাও, তুমি 500 নাও।’
লুৎফর ভাই ছ