• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন |

বিরোধিতা ভালো, দ্বিমত অবশ্যই

প্রথম আলোর ২৬ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মীদের তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার আহ্বান করা হয়েছিল। কর্মীদের লেখা নিয়ে সংকলিত এই আয়োজন।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, প্রথম আলোতে যোগ দেয়ার আমার প্রায় এক বছর পূর্ণ হতে চলছে। সার্কুলেশন বিভাগের মাসিক মিটিং উপলক্ষে রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসেছি। নির্ধারিত সময়ে সকালেই সিএ ভবনের কনফারেন্স রুমে মিটিং শুরু হলো। বিভাগীয় প্রধানসহ সার্কুলেশন টিম সবাই উপস্থিত। কিছু সময় পর সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক একসঙ্গে প্রবেশ করলেন। তার আগেই বার্তা বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত হয়েছিলেন।

আলোচ্যসূচি অনুযায়ী আলোচনা শুরু হলো। কুশল বিনিময় শেষেই সম্পাদক স্যার তার বক্তব্য শুরু করলেন। শুরুতেই তিনি আমাদের টিমের প্রত্যেকের গত মাসের পারফরম্যান্স জানতে চাইলেন। এরপর সার্কুলেশন টিমকে কিছু নির্দেশনা দিলেন। তারপর একটি প্রতিযোগী পত্রিকার সার্কুলেশন পরিস্থিতির তথ্য উপস্থাপন করলেন। বেশ কিছু জেলায় ওই প্রতিযোগী পত্রিকার সার্কুলেশন আমাদের চেয়ে ভালো।

এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি জেলা বাছাই করে নিলেন সম্পাদক। এই পাঁচটি জেলায় প্রথম আলোর সার্কুলেশন কীভাবে বাড়ানো যায়, তার একটি পরিকল্পনা বর্ণনা করলেন। প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা কত হবে, তাও নির্ধারণ করে দিলেন।

আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত করা সম্ভব, তবে এইভাবে নওগাঁ জেলায় প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। মনে মনে যা ভেবেছিলাম, সম্পাদক স্যার আমার উত্তর শুনে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন।

এই পাঁচটি জেলার মধ্যে একটি ছিল আমার কর্মক্ষেত্র নওগাঁ। সম্পাদক স্যার তার বক্তব্যের শেষের দিকে আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে ইশারা করলেন। জানতে চাইলেন এটি সম্ভব কি না, এবং নওগাঁয় আমরা প্রত্যাশিত ফলাফল পাব কি না। তার হঠাৎ প্রশ্নে আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম।

আমি কী বলব, মনে যা আছে তাই, না কি সম্মত হয়ে যাব? কয়েক সেকেন্ড ভাবার পর, ঝুঁকি নিয়েই বললাম, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত করা সম্ভব, তবে এইভাবে নওগাঁ জেলায় প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। মনে মনে যা ভেবেছিলাম, সম্পাদক স্যার আমার উত্তর শুনে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, আমি প্রথম আলোতে কতদিন। বললাম, প্রায় এক বছর। এরপর কেন সম্ভব না, তা জানার আগেই প্রথম আলোর অর্জনের ইতিহাস থেকে তিনি প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিল, যেন কানে ঝিঁঝি পোকার শব্দ আর বুকে ফাঁপরের হাওয়া চলছে। মনে হলো, যেন আমি স্বেচ্ছায় বিপদের মধ্যে পড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছি! পরিস্থিতি বুঝে তিনি পরবর্তীতে প্রশ্ন না করে চুপচাপ থাকলাম। শুধু পরিবেশ সহজ করার জন্য দু’তিনবার স্যরি বললাম। কিন্তু সম্পাদক স্যার যেন তা শুনছিলেন না।

কিছুক্ষণ পরে তিনি মিটিং থেকে চলে গেলেন। তিনি কোন প্রয়োজনে গেলেন, নাকি আমার উপর রেগে গেলেন, ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিন্তু মনে হলো, আমার কথায় রেগে গিয়েই তিনি চলে গেলেন। মনে মনে খুব লজ্জা পেলাম। এখন যদি ‘চিচিং ফাঁক’ নামে কোনও জাদুকরি দরজা খোলার ক্ষমতা পেতাম, তাহলে সেই দরজা দিয়ে এখান থেকে পালিয়ে যেতাম।

খাওয়ার সময় শান্ত কণ্ঠে সম্পাদক স্যার বললেন, ‘তুমি তখন আমার কথার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলে, তোমার তো অনেক সাহস।’ বলেই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।

মিটিং যথারীতি চলছে। নির্ধারিত এজেন্ডা অনুযায়ী আলোচনা, সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা হচ্ছে। কিন্তু আমার মনের অবস্থা তখন এমন ছিল যে, ভরা মিটিংয়ে উপস্থিত থাকলেও আমি কিছুই শুনতে বা বুঝতে পারছিলাম না। সংজ্ঞা ফিরল যখন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আমার নাম ধরে ডাকলেন। জানালেন, কেন মিটিংয়ের সময় আমার মনে হয়েছিল যে নওগাঁয় এইভাবে প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। প্রথমে কিছু বলতে চাইলাম না। তারপর একপ্রকার বাধ্য হয়ে কারণগুলো এবং আমার যুক্তিগুলো বললাম। এটাও বললাম যে, নওগাঁ শুধু আমার কর্মক্ষেত্রই নয়, আমার জেলাও। তাই নওগাঁ জেলা নিয়ে আমার স্বচ্ছ ধারণা আছে। আমার তথ্য ও যুক্তি শুনে উপস্থিত প্রায় সবাই আমার পক্ষে মত দিলেন। এবার নিজেকে কিছুটা হালকা অনুভব করলাম। আবার মিটিংয়ে মনোযোগ দিলাম।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময় হঠাৎ দেখি সম্পাদক স্যারও আমাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিচ্ছেন। চেয়ারে বসেই তিনি আমার দিকে হাত নাড়িয়ে তাঁর পাশে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন। কাছে যেতেই বললেন তাঁর পাশের চেয়ারে বসতে। আমি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে ‘না’ বললাম। এবার তিনি ধমকের সুরে বললেন। অগত্যা তাঁর পাশে চে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *