• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন |

আমাদের একতাবদ্ধতায়, আমাদের শক্তি

আমাদের সম্মিলিত সাহস

আমার প্রাণ ভোলানো খিদের অনুভবটা তখন বোধহয় হারিয়ে ফেলেছিলাম। খাওয়া বলতে যা বোঝায়, তা কেবল রাতের বেলাই ঘটত; সকাল ১০টায় না খেয়েই হল ছাড়তাম, মিটিং করতাম, মিছিল করতাম। আর রাতে ১০টায় রুমে ঢুকে ভাবতাম পরদিন কীভাবে আরও মেয়েদের আন্দোলনে আনা যায়। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ তৈরি করে মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। ১ জুলাই থেকে আমার এই জীবন বদলে গেল। আসলে, জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, সেদিন থেকে আর কোনো রাত ঠিকভাবে ঘুমাতে পারিনি। মনে শুধু তখন একটাই টেনশন ছিল—কারণ কি হবে।

তেমনই একটি দিন ছিল ১৪ জুলাই। সেদিন সকাল থেকে শরীরটা অসুস্থ ছিল। ‘মার্চ টু বঙ্গভবন’ কর্মসূচি করে রোদে পুড়েছি। সব শেষ করে রাত আটটার দিকে বাইরে থেকে ভাত কিনে হলে ঢুকছিলাম, তখন খিদেয় মাথা ঝিমঝিম করছিল বটে, তবে ক্রোধের চোটে খেতে পারছিলাম না।

১৪ জুলাই সন্ধ্যায় জানতে পারলাম, শেখ হাসিনা আমাদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলেছেন। তখন রক্ত চোখে উঠে এলো। সেই মুহূর্ত থেকেই ভাবছিলাম কীভাবে এই অপমানের জবাব দেব। সারাদিনের খাওয়া-দাওয়া ছাড়াই সেই সময় আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। তবু হলে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশ্চর্য ব্যাপার, ক্লান্তি কেটে গেল, সারা শরীর তখন ঝরঝরে। দুই লোকমা ভাত গিয়ে নিচে যাওয়ার পর দেখি, মেয়েরা সব ক্ষোভে ফুঁসছে। মিছিল নিয়ে আমরা বের হলাম। তার পরের দিন আমাদের বেধড়ক মেরেছে পুলিশ। আমিও মার খেয়েছি।

๕ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই আমি সেখানে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। সে সময় ‘কোটা পুনর্বহাল চাই না’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে আন্দোলনের কার্যক্রম চলছিল। সেখানে তখন মেয়েদের উপস্থিতি খুবই কম ছিল। তখন মনে হলো মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে আমার হলের জুনিয়র রুকু আক্তার ও সায়মার সঙ্গে বসে পরিকল্পনা করলাম। তারাও আমার সঙ্গে একমত হয়। এরপর আমরা হলের অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বললাম। আমরা সুফিয়া কামাল হলের জন্য একটি আলাদা হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপ খুললাম কিন্তু আন্দোলনের প্রতি সমর্থন থাকলেও মিছিল বা অন্য কর্মসূচিতে অংশ নিতে মেয়েরা ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। তখন আমরা মেয়েদের বলতাম, ‘আওয়ামী লীগের শাসনকালে সরকারের কাছ থেকে আমরা একটিমাত্র দাবি আদায় করেছি—কোটা বাতিল। এখন সেটি পুনর্বহাল করে সরকার আমাদের অপমান করেছে। এরপরও কি আমরা চুপ থাকব? নিজেদের অপমান মেনে নেব?’ এমন ধরনের কথায় মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ধীরে ধীরে আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে তারা। প্রথমে ২ জুলাই তিনটি মেয়ে নিয়ে হল থেকে বের হই। ৩ জুলাই হল ১০ জন। আমাদের কর্মসূচি যখন থাকত, প্রায় একই সময়ে কর্মসূচি দিত ছাত্রলীগ। অনেক মেয়ে সেই কর্মসূচি এড়িয়ে আগেভাগেই হল থেকে বেরিয়ে আসত। এরপর আমাদের কর্মসূচিতে যুক্ত হতো টিএসসি থেকে। ধীরে ধীরে জনসংযোগ বাড়িয়েছি। আমরা যারা সংগঠক ছিলাম, তারা হলের মেয়েদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলতে শুরু করি। এতে মেয়েদের ভরসা বাড়ে। ৬ জুলাই মেয়েদের একটি বড় দল নিয়ে হল থেকে বের হলাম। সেদিন আমাদের কী আনন্দ! শরীর ও মাথায় বাংলাদেশের পতাকা জড়িয়ে মিছিল করলে একটা শিহরণ জাগত মনে। মনে হতো আমরা জয়ী হব। মেয়েদের অংশগ্রহণ ক্রমে বেড়েই চলল। এ সময় নাহিদ ইসলাম ভাই বললেন, ‘আন্দোলন পরিচালনার জন্য মেয়েদের হল থেকে পাঁচটি প্রতিনিধি লাগবে।’ এবার আমরা কবি সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থীরা পড়লাম বিপদে। আন্দোলনে সবাই থাকবে, কিন্তু কেউ প্রতিনিধি হতে চায় না। চারবার নাম পরিবর্তন করে এরপর প্রতিনিধিদল নির্বাচন করতে পেরেছিলাম।

এর মধ্যে ছাত্রলীগের এক নেতা আমার ভাইকে ফোন করে আমার খবর নেওয়ায় ভয় পেয়ে যান বাড়ির লোকজন। আমার মা-বাবাও তখন আমাকে থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি তো পিছু হইনি। এখন খাওয়া, ঘুম—কোনোটারই নিয়ম নেই। বাংলা ব্লকেডে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছি। গাইছি, ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’, ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’।

মনে আছে, ১৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার দিন তীব্র রোদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আসলে তখন ঠিকমতো খাওয়ার সময়ও পেতাম না। বমি করতাম প্রায় প্রতিদিন সকালে।

তত দিনে পুলিশ আমার পেছনে লেগেছে। তবে ভয় পাইনি। কারণ, প্রতিদিনই ম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *