• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন |

শিশুদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপ্লিকেশন

চাকরীর ব্যস্ততা ও সংসারের দায়িত্বের চাপে দিনগুলো কীভাবে কেটে যাচ্ছে তা টের পাচ্ছিলাম না। জুলাই মাসের শুরুর ১০-১২ দিন আন্দোলনের কোনো খবরই আমার কাছে পৌঁছায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু-একটি লিংক এবং অফিসের লাঞ্চের ফাঁকে বা ফোনে আলাপে এলে অল্প কিছু জানতাম শুধু। ছাত্ররা আবারও কোটা বাতিল চাইছে, ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ, মিছিল আর পথ অবরোধের খবর পেয়েছিলাম।

এর মাঝেই হঠাৎ একদিন, ১১ অথবা ১৪ তারিখে অনেক দিন পর অভূতপূর্ব এক ঘটনা ঘটল। দুপুরে অফিসের কাজে বেরিয়ে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের কাছাকাছি এলে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী আমার গাড়ি ঘিরে ধরল। তারা বেশ ভদ্রভাবে বলল, আর গাড়ি নিয়ে এগোতে পারব না। কারণ তারা রাস্তা অবরোধ করেছে। আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করলাম যে আমার পায়ে ব্যথা আছে, তাই আমার ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম করুক তারা। কিন্তু তারা অটল। গাড়ি নড়বে না।

এর মধ্যে একটা মিষ্টি মুখের মেয়ে গাড়ির জানালার বাইরে থেকে বলল, "আপনারা আমাদের সাপোর্ট না করলে আমরা কীভাবে সফল হব?" তার এই কথার পর আর কোনো কথা চলল না। আমি ল্যাপটপের ব্যাগ, জরুরি ফাইল গাড়িতে রেখে নেমে এলাম রাস্তায়।

তারপর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে স্লোগান দিতে দিতে, রাস্তা দখল করে এগিয়ে গেলাম। এর মধ্যে আকাশটা কেমন ঘোলাটে হয়ে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। বৃষ্টিতে ভেজতে ভেজতে আসাদ গেট পেরিয়ে আমরা চলে এলাম আড়ং এর মোড়ে। সেখানেও সাদা পোশাকে স্কুলের অনেক ছাত্র আমাদের ঘিরে রেখেছিল।

আমি ভিডিও করতে করতে, ছাত্রদের সঙ্গে স্লোগান দিতে দিতে ধানমণ্ডির দিকে বাঁক নিলাম। অল্প কিছুদূর গিয়েই আমার বাড়ির রাস্তা। প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের "তোমাদের আন্দোলন সফল হোক" বলে বিদায় নিচ্ছি, হঠাৎ একটা চটপটে ছেলে এসে "আন্টি, হাই ফাইভ" বলে হাত মিলিয়ে দৌড়ে ভিড়ে মিশে গেল। আর আমি তখন ছাত্রজীবনের স্মৃতি মনে করে ঘরে ঢুকলাম।

পরের দিন থেকেই পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের খবরাখবর আর ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্যাতনের ভয়ংকর খবর পড়তে শুরু করলাম। আর ১৬ তারিখের দুপুরের দিকে আবু সাঈদের ভিডিও দেখে আমার পুরো শরীর জড়িয়ে গেল। আমি জানতে পারলাম, সে ছেলেটা ঠিক আমার মেয়েটির বয়সী। সেদিন রাতে আমি ঘুমোতেই পারিনি। মিরপুর রোডে প্রতিবাদ করতে নেমেছে সেই বাচ্চাদের মুখগুলো বারবার মনে ভেসে উঠছিল। ভাবতে থাকলাম, যদি হাই ফাইভ করা সেই ছেলেটিরও আবু সাঈদের মতো কিছু হয়ে যায়?

এর ঠিক একদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ফারহান ফাইয়াজের ছবি ও খবর। সেও রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের ছাত্র। জন্ম ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, ঠিক আমার ছেলের বয়সী। আমার অন্তরে ঝড় বয়ে গেল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর ঘরে বসে থাকা যাবে না। কিছু একটা করতেই হবে। আমার সন্তানসম বাচ্চাদের ওপর নির্বিচারে গুলিতে হত্যা করা হবে আর আমি মা হিসেবে ঘরে বসে থাকব? এটা কি কখনও হতে পারে?

চারদিকে যোগাযোগ করতে শুরু করলাম। বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী, পরিচিত সুহৃদরা একমত, কিছু একটা করতে হবে। কী করা যায় সেটা কেউ জানে না। এলোমেলোভাবে একে অন্যকে ফোন দিচ্ছিলাম। এর মধ্যে কবি মাহবুব মোর্শেদ খবর দিলেন, রাখাল রাহা নামে একজন "সন্তানের পাশে অভিভাবক" নামে কিছু একটা করতে চেষ্টা করছেন। আমার মনের কথাটা যেন তিনি পেয়ে গেলেন। আমি ঠিক এমন কিছু একটাই খুঁজছিলাম। মা হিসেবে আমার সন্তানের সুরক্ষার জন্য যা যা করার, তা করবই।

রাখাল রাহার নম্বর সংগ্রহ করে তাকে ফোন দিলাম। আমাদের অনেক কথা হলো। জানলাম পরের দিন, অর্থাৎ ১৯ জুলাই শাহবাগে সকাল ১০টায় তিনি আরও কয়েকজন অভিভাবকসহ প্রতিবাদ সভা করতে যাচ্ছেন। আমি তাকে বললাম, আমরা পঁচিশের মতো মা-বাবা এক হয়েছি এবং আমরাও এই সভার অংশ হতে চাই। তিনি আমাদের স্বাগত জানালেন। আমি তখনই আমার পরিচিতদের খবরটা জানালাম। ফেসবুকেও খবরটা ছড়িয়ে দিলাম। বাড়িতে বড় কাগজে স্লোগান লিখতে শুরু করলাম। পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীরাও আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

একটু পরপর ফেসবুকে উঁকি দিচ্ছিলাম। দেখলাম, আমাদের পরের দিনের প্রতিবাদ সভার খবরে অনেকে রিচ হয়েছে, শেয়ারও করেছে অনেকে। ভাবলাম সারা রাত আরও অনেক শেয়ার হবে, আরও অনেক মানুষ জানবে, আর আমাদের এই উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে যাবে। অনেক মা-বাবা, শিক্ষক, অভিভাবক যুক্ত হবেন। সবাই মিলে আমাদের প্রতিবাদী সন্তানদের সাহস জোগাব।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে টের পেলাম ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুশ্চিন্তা নিয়ে লক্ষ্য করলাম মাত্র ১০০ জনই আমাদের সভার খবরটি শেয়ার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *