• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন |

অভিবাদন দেওয়ার অনন্য মুহূর্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতন দিয়ে রিকশা চালাইলেই গর্ব আর গৌরববোধে বুক ফুলে ওঠে আমার। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো আবু সাঈদ আর মুগ্ধর সঙ্গে ছাত্রদের প্রতি আমার সেলামী জানানোর সেই ছবিও দেয়ালে এঁকেছেন ছাত্ররা। রিকশাচালক হয়েও ছাত্ররা আমাকে ভুলে যায়নি। এখন তো আমার নামই হয়ে গেছে সেলিউট সুজন।

আমার ঘরে টেলিভিশন নেই। আমার মোবাইল ফোনটাও আধুনিক না। পুরনো ধরনের একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রাম এলাকার একটি চায়ের দোকানে কখনো কখনো যাই। সেখানে গেলে দোকানের মালিক টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোল আমার হাতে তুলে দেন। দিয়ে বলেন যা দেখতে ইচ্ছা করে তাই দেখতে। সেখানেই টেলিভিশনের খবরে প্রথম জানলাম কোটা নিয়ে আন্দোলন সম্পর্কে। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন এক দফার আন্দোলনে পরিণত হয়। সবার সে কী উত্তেজনা, সে কী সাহস! স্বৈরাচারী সরকারের পতনের সেই আন্দোলনে আমার মন ছিল। আমিও এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছি। ছাত্রদের আন্দোলন দেখে যে সময়ে সেলামী দিয়েছি, সে সময় স্বৈরাচারী সরকার এখনও ক্ষমতায় ছিল। একপর্যায়ে সরকারের পতন ঘটে।

আন্দোলন চলাকালীন, আমি প্রায়ই রিকশা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম। বিভিন্ন খুঁটিনাটি পথ ঘুরে ছাত্রদের তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতাম। ছাত্রদের কত লাশ যে সেখানে দেখেছি। পুলিশ আর ছাত্রলীগের লোকেরা ছাত্রীদেরও রেহাই দেয়নি। সবই নিজের চোখে দেখতাম আর ভাবতাম, আমি শুধু বসে আছি।

সব দিন-তারিখ তো মনে নেই, কিন্তু কত ঘটনা। একটি শনিবার ছিল। ছাত্ররা এসে স্প্রে দিয়ে পুলিশের গাড়িতে নানা কথা লিখে দিল। আমি রিকশা নিয়ে দোয়েল চত্বরের কাছে গেলাম। চারপাশে নদীর জোয়ারের মতো ছাত্ররা যাচ্ছে। আমার মনটা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠল। আমি হঠাৎ রিকশার সিটে উঠে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের সেলামী দিলাম। আসলে সেদিন আমি ছাত্রদের সেলামী দিইনি, আমার মনের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভেসে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। তবে এটা জেনেছি, মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য নিজের প্রাণের মায়া করেননি। এই আন্দোলনেও ছাত্রছাত্রীরা পুলিশ এবং ছাত্রলীগের ছেলেদের আক্রমণ বা গুলিবর্ষণ নিয়ে ভয় পায়নি। আমার মনে হলো, গুলিকে ভয় না পাওয়া এই ছাত্ররা তো মুক্তির জন্য লড়াই করা যোদ্ধা। শেখ হাসিনার মনে হয়েছিল, তারা ‘রাজাকারের নাতিপুতি’। আর আমার কাছে মনে হয়েছে, এই ছাত্রছাত্রীরা মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতি। ছাত্রদের সেলামী দেওয়ার সেটাই ছিল কারণ।

এই আন্দোলনের সময় নিজের কাছে একটি জাতীয় পতাকা রেখেছিলাম। সেই সময়টা আমার মাথায় জাতীয় পতাকাটা বাঁধা ছিল। আমি প্রায় ১০ মিনিটের মতো সেলামী দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখি, ছাত্রছাত্রী, সাংবাদিক আর মানুষজন এসে আমার ছবি তুলছেন। পরে শুনতে পেলাম, আমার সেই ছবিটা নাকি ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল কী জিনিস, সেটা আমি জানতাম না। অনেকেই বলতে থাকল, তুমি তো এখন ভাইরাল। সবাই তোমাকে চেনে। ছাত্ররাও সেলামী দেওয়া সেই ছবিটা বড় করে প্রিন্ট করে আমাকে দিয়েছে। ঘরের দেয়ালে আমি সেটা লাগিয়ে রেখেছি।

প্রথম আলোতেও আমার এরকম একটি ছবি ছাপা হয়েছিল। পাড়ার একজন, সে-ই আমাকে এনে কপিটা দিয়েছে। আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

ছবি ভাইরাল হওয়ার পরও আমি আন্দোলনে যেতাম। অনেকে ভয় দেখিয়েছিলেন, পুলিশ গুলি করতে পারে। আমি মোটেই ভয় পাইনি। রিকশা চালিয়ে কত টাকা ভাড়া পাব, সেই চিন্তাও তখন মাথায় ছিল না। আমার কাছে পানি থাকলে ছাত্রদের দিতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার হকাররাও ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

আমার সেলামী দেওয়ার ছবি দেখে অন্য রিকশাচালকেরাও আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। আমাকে চিনতে পেরে এখন অনেকেই আমার সঙ্গে ছবি তুলতে চান। এটা তো অনেক সম্মানের।

আমি দিন আনি দিন খাই। অভাবের সংসার। তবে স্ত্রী শান্তা আক্তার সিনথিয়া আর পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে শুকরান আহমেদকে নিয়ে আমার সুখের সংসার। শান্তা প্রায়ই আমার হাতের তালুতে মেহেদি দিয়ে নিজের নাম লিখে দেয়।

সংসারটা সব সময় এমন সুখের ছিল না। বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়েছিলাম। শান্তাকে অনেক অত্যাচার করতাম। সেসব সঙ্গ বাদ দিয়েছি। শান্তা আর আমি এখন বন্ধুর মতো হয়ে গেছি। এখন বুঝতে পারি, পারিবারিক অশান্তি করে ভালো থাকা যায় না।

ছোটবেলা থেকেই খুব জেদি ছিলাম। অন্যায় দেখে চুপ করে থাকতে পারতাম না। নিউমার্কেটে কুলিগিরি করেছি। রাস্তায় থেকেছি। মানুষের মার খেয়েছি। কত কষ্ট যে করেছি, বলে শেষ করা যাবে না। তবে মানুষের বিপদে কখনো চুপ করে বসে থাকিনি।

অর্থসম্পদ না দিলেও


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *