• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন |

সংবিধান সংস্কারের রূপরেখা

সম্প্রতি আমরা দেখেছি যে, ১৯৯১, ২০০১, ২০০৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনগুলিতে পর্যায়ক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। কোনো দলই পরপর দুইবার ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তারপর থেকে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। একপর্যায়ে ২০১১ সালে তিনি অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক ও একপক্ষীয়ভাবে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাদ দেন। তিনি বিরোধী দলকে দমন করার জন্য আদালতকেও ব্যবহার করেছেন। ২০১০ সালে তদানীন্তন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এবং তার গোপন ও স্বার্থানুসন্ধানী তৎপরতার কারণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৪ বিচারপতির বিপক্ষে ৩ বিচারপতির রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিল।

ফলস্বরূপ, ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৪ সালে আবার সরকার গঠন করে। সংবিধানের কোনো সংশোধন বা পরিবর্তন ছাড়াই দেশ আবারও একদলীয় শাসনব্যবস্থায় প্রবেশ করে। তারপর কী ঘটেছে সবার জানা। প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে এবং দলে ও দলের বাইরে তাঁর একক কর্তৃত্ব ও পছন্দ-অপছন্দ চাপিয়ে গত দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনা একনায়ক হয়ে উঠেছেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান সবচেয়ে শীর্ষ নির্বাহীদের সমান। কিন্তু আমাদের বর্তমান সংবিধান সেই নীতি লঙ্ঘন করেছে। এছাড়াও, একজন ব্যক্তি কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন তা সংবিধানে নির্দিষ্ট করা হয়নি। বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভা সংসদের প্রতি দায়বদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের বিচারিক ক্ষমতা বিচার বিভাগের এবং আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। সুতরাং, নির্বাহী ক্ষমতাকে এককভাবে একজন ব্যক্তির ওপর অর্পণ করা ক্ষমতার বিভাজনের নীতি লঙ্ঘন করেছে।

গতানুগতিক গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান সমমর্যাদায় নির্বাহীদের মধ্যে প্রথম হওয়া উচিত ছিল। আমাদের বর্তমান সংবিধানে এই নীতি উপেক্ষা করা হয়েছে। এছাড়াও, একজন ব্যক্তি কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। ১৯৭২ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার সময় এই ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। প্রবীণ সদস্যরা মতামত দিয়েছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করার জন্য সংসদের অনাস্থা ভোটের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরচারিতা প্রতিরোধের জন্য একমাত্র নিরাপত্তাব্যবস্থা।

কিন্তু আমরা সবাই জানি যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংসদ যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়নি। সংসদের এই দুর্বলতার জন্য অনুচ্ছেদ ৭০-এর বাধানিষেধ, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অভাব এবং পরিবার ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতি ইত্যাদি কারণ দায়ী। এছাড়াও, সংবিধান রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা অবশ্যপালনীয় মৌলিক নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করেনি। এটিও একটি উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা।

অনেকের মতে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতা ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি। আমি এই মতামতের সাথে একমত নই। সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা দরকার নেই। আমাদের সংবিধানে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন ও ভারসাম্যের ঘাটতি রয়েছে।

রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিশ্চিত করা এবং সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুচ্ছেদ ৭০ এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়া ও ভোট দেওয়ার ওপর বিদ্যমান বাধানিষেধ পুরোপুরি তুলে দিতে হবে। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং সংসদের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আরও দুটি বিষয়ে সংস্কার জরুরি। প্রথমটি হল, কোনো ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে দুই মেয়াদের বেশি না থাকার বিধান এবং সংসদের মেয়াদ পাঁচ থেকে কমিয়ে চার বছরে নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণের পদ্ধতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং এটিকে সংবিধানে সুরক্ষিত করা জরুরি।

বর্তমান সংবিধানের আরেকটি ভিন্ন কিন্তু মৌলিক দুর্বলতা হল বাঙালি জাতীয়তাবাদের দুর্বলতা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি কর্তৃত্ববাদী ধারণা এবং এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও সাংবিধানিকতার বিপরীত। ১৯৭২ সালের সংবিধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ অবাঙালি সব জাতিকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের জাতি গঠনের প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক জনগণের ধারণার আওতা থেকে তাদের বাদ দিয়েছে। ১৯৭৩ সালে এবং তার পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন গোষ্ঠীর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *