• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন |

সংবিধান সংস্কার: পথ ও পরিসীমা

সংবিধান সংস্কারের পথ ও প্রয়োগ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের দুর্দশার সমাধানে রাষ্ট্র সংস্কার ও সংবিধান সংস্কারের গুরুত্ব এখন সর্বজনস্বীকৃত। তবে এই পরিবর্তনের পরিধি ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ সংশোধন চাইছেন, অন্যেরা সংস্কারের পক্ষে। কেউ আবার সম্পূর্ণ নতুন সংবিধানের প্রস্তাব দিচ্ছেন।

সংবিধান সংশোধন করা যায় দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন নিয়ে। অন্যদিকে, উচ্চ আদালত সংবিধানের রক্ষক। সংবিধানের যে কোনো সংশোধনী আইনসম্মত কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব উচ্চ আদালতের। বাংলাদেশের সংবিধান বেশ কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে। কিছু সংশোধনী উচ্চ আদালত বাতিলও করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানকে মোট দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগকে বলা যায় রাষ্ট্রের ঘোষণাপত্র বা আকাঙ্ক্ষা। অন্য অংশ তৈরি করা হয়েছে সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। সংবিধান তার মূলনীতি অধ্যায়ে (দ্বিতীয় ভাগ) রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা বর্ণনা করেছে। আবার, এই আকাঙ্ক্ষাগুলো আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে না, এই কথাও ঘোষণা করেছে ৮(২) অনুচ্ছেদে। এতে করে মূলনীতি কাগুজে প্রতিশ্রুতি এবং সরকারের ইচ্ছাধীন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তৈরি করা ক্ষমতাকাঠামো মোটামুটি সবটাই মূলনীতির সাথে বিরোধী। মূলনীতি অধ্যায়ে লেখা আকাঙ্ক্ষার বিপরীত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই ক্ষমতাকাঠামো যথেষ্ট উপযোগী এবং প্রলোভনস্বরূপ। ফলে, বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোতে পরিবর্তন ছাড়া একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন শুধু অসম্ভবই নয়; এই ক্ষমতাকাঠামো বহাল রেখে যতদিন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, ততদিন এটি জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কাজ করে যাবে।

এই কারণেই আমরা সংবিধানের ক্ষমতাকাঠামো অংশটিকে বদলে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব দিচ্ছি। এই পরিবর্তন ব্যাপক এবং মৌলিক। এটিকে সংশোধন বলা যেতে পারে না। ‘সংশোধন’ শব্দের প্রচলিত সংজ্ঞার চেয়ে এই পরিবর্তন ব্যাপক এবং ভিন্ন। তবে এই পরিবর্তন সংবিধানের সবকিছু বদলে দেওয়া বা সম্পূর্ণ নতুন করে লেখা নয়। তাই আমরা এই পরিবর্তনকে ‘সংবিধান সংস্কার’ বলছি। যেহেতু আমাদের প্রস্তাব রাষ্ট্রে বিপ্লবী পরিবর্তন নয়, বর্তমান সমাজবাস্তবতা বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি কর্মসূচি, সেক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবনা তার সাথে সমঞ্জস্যপূর্ণ।

সংবিধানে ক্ষমতাকাঠামো শুরু হয় চতুর্থ ভাগ থেকে। আমরা ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে আলোচনাটি সংবিধানের ক্রমানুসারে না করে, ভোগান্তির ক্রমানুসারে করতে পারি। যেমন, আমাদের প্রথমেই সংস্কার করতে হবে নির্বাচন ব্যবস্থা। এ জন্য ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার ব্যবস্থাটি সবার আগে বদলাতে হবে (১২৩.৩)। আইনসভা বা সংসদে নির্বাচিতরা যাতে দলীয় প্রধানের অনুগত প্রতিনিধি না হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে (৭০)। রাজনীতিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে যাতে কেউ ব্যবহার করতে না পারে, তার জন্য সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়নকে তাদের একমাত্র দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আইন প্রণয়ন ছাড়া রাষ্ট্রের আর্থিক কোনো ক্ষেত্রে আর কোনো ভূমিকা রাখার ক্ষমতা তাদের দেওয়া যাবে না (৬৫)।

সংসদ যেসব আইন প্রণয়ন বা অনুমোদন করে, সেসব আইন যাতে সংবিধানসম্মত হয় এবং সংবিধানসম্মত সেসব আইন যাতে যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়, তা দেখভাল করার দায়িত্ব আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সে জন্য উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং বিচারকাজে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিচার বিভাগের অধীনে আনার ব্যবস্থা করতে হবে (৯৫/১৩৩)। পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা পুলিশের হাতে রাখা যাবে না। বিদ্যমান ‘স্থানীয় শাসন’কে প্রকৃত স্থানীয় সরকারে রূপান্তরিত করতে হবে। জনগণের জন্য সেবামূলক এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের কাছে দিতে হবে (৫৯/৬০)। বর্তমান সরকার এবং প্রশাসনের অবাধ এবং একক কর্তৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের অধীন রেখে ক্ষমতার যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, তা পরিবর্তন করতে হবে ৪৮(৩)। নির্বাচন কমিশন, বিচারক, অ্যাটর্নি জেনারেল, মহাহিসাব নিরীক্ষক, কর্ম কমিশনসহ সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি ইত্যাদি নির্ধারণের জন্য ‘সরকারি দল-বিরোধী দল-বিচার বিভাগ’ সমন্বয়ে আলাদা কমিশন গঠন করতে হবে। লুটপাট ও পাচার বন্ধ করে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রকৃতিস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *