• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন |

সবার দেশ

দেশটা সবার হোক

এই অগ্নিঝরা বর্ষায় ঘটে যাওয়া যে গণ-অভ্যুত্থান, তার নেপথ্যে কোনো জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা অনুঘটক হিসেবে মুখ্য হয়ে উঠেছিল, এমন নয়। দীর্ঘ স্বৈরাচারী অপশাসনের বিরুদ্ধে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জনমানুষের ক্ষোভের উদ্গীরণ এই আন্দোলনে আকার পেয়েছিল। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে স্বৈরশাসন বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে হেজেমনি জারি রাখতে চেয়েছিল, এই আন্দোলন শাসকের অনেক অনুষঙ্গের মতো সেটিকেও ছুড়ে ফেলে দেয়। ছুড়ে ফেলে দেয় বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে বনিয়াদি সংগ্রাম, সেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’কে নিয়ে শাসকের যে অশ্লীল বেসাতি, সেটাকে। ‘চেতনা’ কথাটির গা থেকে হেজেমনির আবরণ খসে পড়ার পরে তা স্বৈরশাসনবিরোধী মানুষের মুখের ব্যঙ্গাত্মক গালিতে পর্যবসিত হয়েছিল।

আমার মতে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ দাঁড়িয়েছিল অন্তত দুটি ভুল পূর্বানুমানের ওপর: ক. ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে রায় দিয়েছে; এবং খ. জাতিরাষ্ট্রের সীমানা ছাপিয়ে বাঙালির অভিন্ন একটি সত্তা রয়েছে। এ দুই পূর্বানুমানই আমার বিবেচনায় ছিল অর্ধসত্য।

প্রথম পূর্বানুমানের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। এই ভূখণ্ডের মানুষ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ছেড়ে এসেছেন। তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা নিজেদের মুসলমান সত্তাকে রহিত করেছেন বা মুসলিম পরিচয় ছেড়ে এসেছেন। মানুষ বরং ওই একাত্তরেও পাকিস্তানিদের বর্বরতা দেখে শিউরে উঠে বলেছেন, ‘তারা কেমন মুসলমান যে নামাজে দাঁড়ানো আরেকজনকে গুলি করে মেরে ফেলে।’ পাকিস্তানকে তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামের ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করেই বাতিল করেছেন।

ধর্মনিরপেক্ষতাকে আমরা যারা শুভ বা কল্যাণকর বলে বিবেচনা করেছি, তারা মূলত ছিলাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের ফুট সোলজার—শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। কিন্তু এই শ্রেণিগত ধর্মনিরপেক্ষতার আকাঙ্ক্ষা কখনোই আপামর জনমানুষের চাওয়া হয়ে ওঠেনি। সত্যি কথা হলো, জনমানুষের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার মর্মবাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে ধরনের সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল—সেক্যুলার শাসকদল কিংবা তাদের অনুসারীদের দিক থেকে কখনোই তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

জাতীয়তাবাদ তথা যেকোনো পরিচিতিনির্ভর রাজনীতির একটা সংকট হলো পরিচয় গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাই একাধারে গ্রহণ ও বর্জনমূলক। যেমন বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাঙালি নয়, কিংবা তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমন সব পরিচয় ও বর্গকে পর করে, তা সে মুসলমান, বিহারি, চাকমা, যা-ই হোক না কেন।

এবারে আসা যাক দ্বিতীয় পূর্বানুমান, অর্থাৎ অভিন্ন বাঙালিত্বের প্রসঙ্গটিতে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি বলে যেসব মানুষ বাস করেন, তাঁদের মধ্যে ঐক্য ও সাদৃশ্য অবশ্যই ছিল। সীমান্তের দুই পারে বসবাসরত এসব মানুষ—বহু বছর ধরে পরস্পরের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ভাগাভাগি করে চলছিলেন। সাতচল্লিশের আগে তাঁরা তো একই দেশের বাসিন্দাই ছিলেন। এমনকি সাতচল্লিশে সীমান্তরেখায় বিভাজিত হওয়ার পরও তাঁরা একে অন্যের কাছ থেকে দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়েছেন। সেই দেওয়া-নেওয়া যদিও কোনোভাবেই সহজাত ছিল না—সমপর্যায়ীও ছিল না। কিন্তু এই ঐক্য ও সাদৃশ্যের ব্যাপারটা বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন সাতচল্লিশের দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে পূর্ববঙ্গ–পূর্ব পাকিস্তান বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং তার প্রতীক (আইকন) হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে খুবই কার্যকরভাবে সামনে নিয়ে আসে। অখণ্ড পাকিস্তানের অস্তিত্বের দুই যুগজুড়েই যে আতঙ্ক পাকিস্তানি শাসকদের তাড়া করে ফিরছিল, তা হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা যেকোনো সময়েই পশ্চিমবঙ্গের, তথা ভারতের বাঙালিদের সঙ্গে মিশে যাবে। এই অঞ্চলে বিরাজমান ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলা’র আওয়াজকে পাকিস্তানি শাসকেরা ভারতীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে পেয়েছিলেন এবং সেই ষড়যন্ত্র রুখতে সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পরমুহূর্ত থেকে তাঁরা অজস্র প্রকাশনা নিষিদ্ধ, বাজেয়াপ্ত করা—এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সে সময় নব্য বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের ডামাডোলে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল সীমান্তরেখার দুই পারের দুই বাংলার মধ্যকার ঐতিহাসিক ভিন্নতা, যার সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম।

এবারে সেই ভিন্নতার প্রসঙ্গে আসা যাক। সীমান্তের দুই পারে ভাষাগত ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য সত্ত্বেও দুই বাংলার উৎপাদনব্যবস্থা ও অর্থ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *