• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১১:২৫ অপরাহ্ন |

রাষ্ট্র সংস্কার ও ভিন্ন জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্তি

রাষ্ট্র সংস্কার ও বহু জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্তি

প্রস্তাবনা

বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্মের, বাংলা, গারো, সাঁওতাল, মুন্ডাসহ নানা জাতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বহুত্ববাদী সমাজের সব স্তরের মানুষের সমান উন্নয়ন সাধিত হয়নি। বাঙালি ছাড়া অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর জীবনযাপন এখনো সুবিধার মধ্যে নেই। তারা এখনো সঠিক পরিচয় নির্ধারণের লড়াইয়ে ব্যস্ত। নিজেদের বাস্তুভূমি রক্ষার সংগ্রাম তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। প্রতিনিয়ত ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের আতঙ্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং নানাভাবে পীড়নের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের।

অবহেলিত জাতিগোষ্ঠীগুলোর দুর্দশা

উত্তরবঙ্গে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মানুষদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে তিনজন সাঁওতালকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। দক্ষিণবঙ্গের সাতক্ষীরায় মুন্ডাদের জীবনযাত্রা হাহাকার জানান দেয়। বরগুনা ও পটুয়াখালীর রাখাইনদের অবস্থা আরো করুণ। সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের খাসিয়ারা নিজেদের জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে।

পাহাড়ি চুক্তির অবাস্তবিকতা

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এই চুক্তির আওতায় আদিবাসীদের কার্যকর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিশেষ শাসনব্যবস্থা, তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতিসহ নানা প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিগুলো ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের নিরাপত্তার নামে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরেও পাহাড়ে স্বাধীনতা ফিরে আসেনি। বরং সাম্প্রদায়িক হামলার পরিমাণ বাড়ছে।

রাষ্ট্রের ব্যর্থতা

দেশের সব সংকটে আদিবাসীদের সহযোগিতা থাকলেও রাষ্ট্র তাদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই সংবিধান প্রণয়নের সময় আদিবাসী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আদিবাসীদের সম্মানজনক স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে তাদেরকে "বাঙালি" হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়।

প্রস্তাবিত সংস্কার

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে প্রথমে বাংলাদেশের বহুত্ববাদকে স্বীকার করে নিতে হবে। সংবিধানে আদিবাসীদের সম্মানজনক স্বীকৃতি প্রদান, তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি এবং সামষ্টিক মালিকানা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি জরুরি। এছাড়া, রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে পরিবর্তন করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করবে যে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক বৈষম্যের শিকার হবে না।

সংবিধানের ২৩(ক) ধারা সংশোধন করে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, উপজাতি, সম্প্রদায় শব্দগুলোকে "আদিবাসী" শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা উচিত। এটি আদিবাসীদের মর্যাদা এবং তাদের সংস্কৃতির সংরক্ষণ নিশ্চিত করবে। পার্বত্য চুক্তিকে সংবিধানের অংশ করে তাকে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়া উচিত। এছাড়া, সমতলভূমির আদিবাসীদের সমস্যাগুলো দেখভাল করার জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় বা কমিশন গঠন করা জরুরি।

উপসংহার

এই প্রাথমিক উদ্যোগগুলো একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং বহুত্ববাদী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো এতদিন কোনো সরকারই নেয়নি। এখন সময় এসেছে এসব অবহেলিত জাতিগোষ্ঠীগুলোর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে সংস্কার করার এবং সবার জন্য একটি ন্যায্য ও সমান সমাজ গঠন করার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *