প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে লেখকরা লিখেছিলেন সংবাদপত্রটি নিয়েই। এই বিশেষ সংখ্যায় শুধু কর্মীদের লেখাই প্রকাশ করা হয়েছে।
আমার সঙ্গে যাওয়ার কথা অন্যদের হলেও কেউ যায়নি। তাই সন্ধ্যায় আমি একাই নাট্যশালায় গেছিলাম। সে ছিল ২০১০ সালের মাঝামাঝি। জুলাই মাস। বৃষ্টিভেজা শ্যামল সন্ধ্যায় জিয়া হলের গণরুম থেকে বের হয়েছিলাম। সূর্যসেন হল ক্যাফেটেরিয়া পার হয়ে বাণিজ্য অনুষদের সামনে দিয়ে সি মজুমদার মিলনায়তনের রাস্তা দিয়ে নাট্যশালায় পৌঁছাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনের এই নাট্যশালায় আগে কোনোদিন নাটক দেখিনি। তাই বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলাম। অধিকন্তু, মঞ্চ পরিচালক জয়িতা মহলানবিশের নাটকটি বিনামূল্যে দেখতে পাব। তিনি ছিলেন ডালিম ভাইয়ের বন্ধু। তিনিই আমাকে নাটকটি দেখতে আসতে বলেছিলেন।
বর্ষার বৃষ্টি আর মল চত্বরের কাঁঠালি ফুলের ঘ্রাণে সেদিন ক্যাম্পাসটা আলাদা এক সৌন্দর্যে ভরে গেছিল। সেই সময়টা অনেকটা ঘোরের মতোই পার করছিলাম। সেই দিনের সন্ধ্যেটাও ঘোরলাগারই ছিল। নাট্যশালার মঞ্চের সজ্জা দেখে মন প্রফুল্ল হয়ে উঠল।
এসেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ছয়-সাত মাস। ঝাঁকড়া দীর্ঘ চুলের মাথায় ক্যাপ, ঢিলেজিনস ও টি-শার্ট, পায়ে চপল। এটুকুই ছিল আমার পোশাক। এ পোশাকেই ক্লাস করি, মধুর ক্যানটিনে যাই, গ্রন্থাগারে যাই, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারি। জীবনটা অনেকটা বদলে গিয়েছিল একটি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনে যোগ দেওয়ার পর। তখন ঝড়ের ভয়, ভ্রুকুটির সব ডর কেটে যেতে শুরু করেছিল।
হলের গণরুমে থাকি। কিন্তু ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। গেস্টরুমগুলিও আমার পছন্দ নয়। এই দুটোই জেলা শহর ও গ্রামীণ পরিবার থেকে আসা অনেক ছেলের মেয়ের স্বপ্নের পথে বাধা।
রাতজাগা শুরু হল। ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস হল। একা-দুয়েক বন্ধু নিয়ে বা কখনো একা একা রাতে ক্যাম্পাসে ঘুরি। রাতের আঁধার, মল চত্বরের ফুলের গন্ধ, পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বেঞ্চে শুয়ে আকাশের নক্ষত্র গুনে স্বপ্ন বিনিময়। আমিও নিজের অজান্তেই এই হাটে স্বপ্নের বিনিময় শুরু করেছিলাম।
সেই দিন সন্ধ্যায় নাট্যশালার মঞ্চের সজ্জা দেখে মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠল। মাঝারি আকারের মঞ্চটি নানা গাছপালায় ঠাসা। গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে নানা রঙের আলোর খেলা। এক সুন্দর সুরের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নাট্যশালাটিকে মোহময় করে রেখেছে।
টিকিটের দাম অনুযায়ী বসার স্থান নির্ধারিত ছিল। আমার সামনের কয়েকটি সারের পরে আমার বসার জায়গা। খালি চেয়ারে যেখানে মন চাই বসতে পারি। তাই হাঁটার জায়গার কাছে একটি চেয়ার খালি পেয়ে সেখানে বসলাম।
বসে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ পেছন থেকে একজন কড়া সুরে বলল, “এ্যা-ই, পা নামিয়ে বস!” ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার কি দেখতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে?” তার পর কিছু বাক্য বিনিময় হল আমাদের মধ্যে। কথা বলার সময়েই নাটক শুরু হয়ে গেছে। তার সঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে আমার ডান পা বাঁ পায়ে রাখলাম আর নাটকে মনোযোগ দিলাম।
নাটক শেষে মনে উচ্ছ্বাস আর হৃদয়ে আনন্দ নিয়ে বের হচ্ছিলাম। নাট্যশালা থেকে কয়েক পা যেতেই পেছন থেকে কে ডাকল, “এ্যা-ই!” হাঁটা থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি চকচক করা পোশাক পরা এক লোক দৌড়ে আমার দিকে আসছে। কিছু না ভেবেই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি।
আমি ছুটছি, সেও দৌড়াচ্ছে। তার সঙ্গে আরও কেউ ছিল কিনা, সঠিক মনে পড়ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ, সমাজবিজ্ঞানের নতুন ভবন পেরিয়ে মধুর ক্যানটিনের উঠান অনেক কষ্টে পাড়ি দিই।
আইবিএ গেটের সামনে মূল সড়ক দিয়ে না গিয়ে আড়ালে দৌড়াচ্ছি। হঠাৎ মাটিতে পড়ে আঘাত পেলাম। আমার সঙ্গে চলা লোকটাও পড়ে গেল। তার জোরে জোরে চিৎকার শুনে ক্যানটিনের ভিতর আর বাইরে থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছুটে এল। সৌভাগ্যক্রমে আমার হলের আমার ব্যাচের কয়েকজন সেখানে ছিল। তারা আসার পর আমাকে ক্যানটিনের বাইরে একটি চেয়ারে বসাল। সেই লোকটি ঝাঁপাঝাঁপি করছে।
সবাই আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা আমার কথা শুনে, হলের নাম আর ঠিকানা জেনে আমাকে ছেড়ে দিল।
পরে জানলাম, নাট্যশালায় যে লোকটি আমাকে আদব শেখাতে উদ্ধত হয়েছিল সে হল ক্যাম্পাসে “বোমা আব্বাস” নামে পরিচিত। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা।
এই ঘটনার কয়েক দিন পর গেস্টরুমে গণরুমে বসে আছি। হঠাৎ একজন এসে বলল, “তোকে মারুফ ভাই ডাকছে!” শার্টের বোতাম লাগাত