• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ন |

রাজপথের কবিতায় উচ্ছসিত শিক্ষার্থী

"কবিতা এখন রাজপথে।" ছাত্র আন্দোলনের ঝড়ে রাষ্ট্র যখন কেঁপে উঠছিল, ১৯৬৮ সালে প্যারিসে দেয়ালে দেয়ালে এই স্লোগান লিখে রেখেছিল ছাত্ররা। পুরাতন পৃথিবীকে সেই দিন তারা চুরমার করে দিতে বদ্ধ পরিকর। তাদের মনে হয়েছিল, পুরনো এই পৃথিবী ব্যারিকেডের মতো দাঁড়িয়ে আছে তাদের এগিয়ে যাবার পথে। তাই ছাত্ররা লিখেছিল, "ব্যারিকেড পথ বন্ধ করে, কিন্তু খুলেও দেয় নতুন পথ।" পুরাতন দুনিয়াকে সেদিন তারা ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল এক নতুন দুনিয়ার প্রতি আকাঙ্ক্ষায়। বিপ্লবী রুশ চিন্তাবিদ মিখাইল বাকুনিনের একটি কথা সেসময় তাদের খুব পছন্দের হয়ে উঠেছিল, "ভাঙার আবেগই আসলে সৃষ্টির আবেগ।" সেই আবেগেই উত্তেজিত ছিল এ অল্পবয়সী তরুণরা। রাজপথে তারা কবিতা লিখছিল স্বপ্নের আগুনে, বিপ্লবী হরফে।
এ বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে ইতিহাসের সেই একই আবর্তন আমরা দেখতে পেয়েছি বাংলাদেশের রাজপথে। ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে লিখেছে আন্দোলনের কবিতা, নিজেদের জীবন দিয়ে। মুক্তির স্বপ্নে লাখো লাখো তারা নেমে এসেছে রাস্তায়। সরকারের সামনে দাঁড়িয়েছে অদম্য সাহসে। নতুন নতুন চিন্তা ও কৌশল দিয়ে প্রাণ সঞ্চার করে আন্দোলনকে টিকিয়ে রেখেছে। অবশেষে সেই লৌহপ্রতিম সরকারকে উৎখাত করে ফেলে দিয়েছে।
চার-পাঁচটি কথায় গল্পটা যতটা সহজভাবে বলা গেল, ঘটনাটা ততটা সহজ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পনেরো বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতায় শেখ হাসিনা কেবল কঠোর স্বৈরাচারীই হয়ে ওঠেননি, একেবারে নিষ্ঠুর একজন নিপীড়ক হয়ে উঠেছিলেন। সীমাহীন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোকে দমন করেছেন, সরকারের প্রতিটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে অধীনস্ত করে রেখেছেন, নিবর্তকমূলক আইন এবং আইনবহির্ভূত পথে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করেছেন।
শেখ হাসিনার নিষ্ঠুরতার চরম রূপটি দেখা গিয়েছিল এই আন্দোলনের সময়ই। তাঁর রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী এবং কয়েকটি বাহিনীকে এই রাষ্ট্রেরই নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত করেছেন তিনি। এই হত্যাকাণ্ডের আয়োজন ছিল অকল্পনীয়, ঠিক যেন শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রের যুদ্ধ। রাষ্ট্র ও সরকারকে শেখ হাসিনা তাঁর দলের পকেটে রুমালের মতো গুঁজে দিয়েছিলেন।
কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা অসম্ভব সাহস দেখিয়ে বেঁকে বসেছে। সরকারি চাকরিতে অযৌক্তিক কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হলেও শেখ হাসিনার হঠকারিতায় ছোট একটি গোষ্ঠীর দাবি জনগণের আন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ছাত্রছাত্রীরা তাদের বুদ্ধিদীপ্ত কুশলী কর্মসূচি দিয়ে নানা শ্রেণী, পেশা, গোষ্ঠী এবং বয়সের মানুষকে তাদের সঙ্গে একাত্ম করতে পেরেছে। সরকারের নিষ্ঠুর হত্যাযন্ত্রের সামনে সবাই নির্ভয়ে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে। জনগণ যখন একটি একত্রিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে, কার সাধ্য তাদের ঠেকায়? বাকিটা তো ইতিহাস।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রদের সাহসী উত্থান ঘটেছে বারবার। বিষয়টি আলাদা একটি নিবিড় গবেষণার দাবি রাখে। সামাজিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের একটি অভূতপূর্ব তুলনা এ ক্ষেত্রে না করলেই নয়। উনিশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্রভূমি কলকাতায় মধ্যবিত্ত গড়ে ওঠার পর রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ প্রমুখ বহু আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের আদর্শ বা সংস্কার-ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করেন। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ইতিহাস এবং ভাববস্তুর বারংবার পুনর্বিবেচনার তাঁরা অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের যে পরিবর্তন ঘটে, তার সঙ্গে মিলে সেখানকার সাহিত্যসমাজ এই মনীষীদের নতুন নতুন ব্যাখ্যা হাজির করে, তা আত্মস্থ করে।
পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের ইতিহাস এর বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। এখানে ব্যক্তি নয়, জনগণই প্রধান। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং সবশেষে ২০২৪ সাল এখানে দ্রষ্টব্য। এসব ইতিহাস-মুহূর্তে ব্যক্তির পরিবর্তে জনগণই কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি উজ্জ্বলতম ইতিহাসের অধ্যায়ে জনগণ জেগে উঠেছে। তার চেয়েও বড় কথা, জনগণের আন্দোলন রাষ্ট্র, সমাজ বা বৃহত্তর ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। আর এসব আন্দোলনের প্রথম স্ফুরণ সব সময়ই আমরা ছাত্রদের মধ্যে দেখেছি। তারাই হয়ে উঠেছে এই আন্দোলনগুলোর প্রধান প্রেরণা।
ছাত্রদের হাতে ধরে জনগণ জেগে উঠেছে, আর তার ফলেই পাল্টে গেছে ইতিহাস। অথচ আমরা সেসব ঘটনা নিয়ে কে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *