• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন |

শেহীদ আবু সঈদের বাড়িতে সে দিন

১৬ জুলাই, সকাল থেকেই রংপুরে কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলছিল। বিকেল ৪টার দিকে পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হন বলে জানা গেল। লাশটি রংপুর মেডিকেলে রয়েছে। আমি তখন রংপুর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে বদরগঞ্জে অবস্থান করছিলাম। অফিস থেকে বলা হলো, ‘যত দ্রুত সম্ভব রংপুরে যান, তবে সাবধানতা অবলম্বন করুন।’ অফিস থেকে নিহত ছাত্রের পরিচয় এবং ঠিকানা সমেত বিস্তারিত তথ্য পাঠানো হলো। জানা গেল, নিহত ছাত্রের নাম আবু সাঈদ। তিনি পীরগঞ্জের মদনখালী ইউনিয়নের বাবনপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়তেন।

বদরগঞ্জ থেকে রংপুরে পৌঁছানোর পর অফিস থেকে নির্দেশ দেয়া হলো, দ্রুত আবু সাঈদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। আমি ল্যাপটপ কাঁধে নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে আবু সাঈদের গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে বাবনপুরের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। প্রায় ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার পর জাফরপাড়া বাজারে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে দোকানপাট বন্ধ দেখা গেল। পরিবেশ ছিল সুনসান এবং নিরব। ওই বাজার থেকে বাবনপুরের দিকে মোড় নেয়ার সময় রাস্তার দু-চারজন মানুষের চোখে একপ্রকার অজানা ভয় ফুটে উঠছিল। জাফরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে যাওয়ার পর একজন আমাকে রাস্তাটি দেখিয়ে দিলেন। তখন তখন বিদ্যুৎ ছিল না।

অবশেষে আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তি আবু সাঈদের বাড়িটি খুঁজে পাওয়া গেল। তখন রাত ৭টা ১৫ মিনিট হয়েছে। বাড়ির ভেতর থেকে স্বজনদের কান্না বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছিল। মোটরসাইকেলটি রেখে সরু গলি ধরে গিয়ে মুঠোফোনের টর্চলাইট জ্বালিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম। উঠানে কয়েকজন চেয়ারে বসে আছেন। বারান্দায় একজন তরুণী বুক চাপড়িয়ে কাঁদছেন। পাশে একজন বৃদ্ধা আহাজারি করছেন, ‘আমার সোনার বাচ্চাটিকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলল কেন? সে কাউকে মারতে যায়নি। চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছিল, সেটা কি কোনো অপরাধ? ওই পুলিশ, তুমি কেন আমাকে গুলি করে মারলে না?’

অন্যদিকে তরুণীটি বলছিলেন, ‘ও ভাই, তুমি আমাকে ফেলে কোন দুনিয়ায় চলে গেলে? তুমি ছিলে আমার ভরসা। আমি চাকরি পেলে আমাদের দুঃখ দূর হতো। কষ্ট করে নিজে অর্থ উপার্জন করে আমি লেখাপড়া করেছি। এইটাই কি তার ফল?’

বুঝতে বেশি দেরি হলো না যে, কান্নাকাটি করা বৃদ্ধাটি হলেন আবু সাঈদের মা এবং তরুণীটি তাঁর বোন।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে মানুষের মৃত্যু দেখার ঘটনার সঙ্গে আমাকে বহুবার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু সেদিন আবু সাঈদের মা এবং বোনের কান্না দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলাম না! এমন শোকপূর্ণ পরিবেশে কারো সঙ্গে কথা বলাও কঠিন। পরে একজন প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানা গেল, সাঈদের মায়ের নাম মনোয়ারা বেগম এবং বোনের নাম সুমি বেগম।

রাতভর সাঈদের বাড়ির ভেতর-বাইরে পায়চারি করে কাটাই। অনেক প্রতিবেশী অজানা ভয়ে সেই রাতে সাঈদের বাড়িতে আসেননি।

আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী লাশ আনতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেছেন। অন্য ভাইয়েরা কেউ বাড়িতে ছিলেন না।

আবু সাঈদের লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তাঁর মা, বোনসহ অন্যরা। কিন্তু লাশ কখন আসবে, তা কেউ বলতে পারছিলেন না। রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন ব্যক্তি তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে সেই বাড়িতে আসেন। পরিচয় দিয়ে বললেন, তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ। অন্যজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল আমিন। বাকি দুজন তাঁর সহযোগী। তাঁরা কিছুক্ষণ বাড়ির উঠানে তাঁদের মধ্যে কী আলোচনা করছিলেন, তা জানা যায়নি। পরে তাঁরা চলে যান।

দিবাগত রাত ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে কেউ একজন বললেন, রমজান আলী লাশ নিয়ে রংপুর থেকে রওনা হয়েছেন। আমিও ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত হলাম। এরপর সেখানে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, প্রশাসন থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে রাতেই লাশ দাফন করতে হবে। রাত ২টার দিকে একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স এসে বাড়ির পাশে থামল। সবাই অ্যাম্বুলেন্সের দিকে ছুটে গেলেন। লাশ নামিয়ে উঠানে রাখা হলো। তারপরের ঘটনাটি বর্ণনা করা কঠিন! স্বজনরা কী বিলাপ করছিলেন তা বলে বোঝানো যাবে না!

লাশের সঙ্গে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাঁরা আবু সাঈদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় বাড়ির অদূরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

রাতের বেলায় হঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *