নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় ২০১৭ সালে স্থাপিত হয়েছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ প্রায় ০৯ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়ে উঠেনি, গড়ে উঠেনি শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাড়া করা নিম্নমানের পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করছে, যার ফলে উচ্চ শিক্ষার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গত ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুথানের পর শিক্ষার্থীরা ভেবেছিল বর্তমান প্রশাসন তাদের সমস্যা দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাস্তবে ক্যাম্পাসের সমস্যা নিরূপণে কোন উদ্যাগ এখন পর্যন্ত সফলতা পাইনি।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেরুয়ারী, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের উপর একটি সাংবিধানিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। সারাদেশে নির্বাচনী হাওয়া বইছে ঠিক এ সময়েই রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে তড়িঘড়ি করে নিয়োগের হিড়িক পরেছে। অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও প্রমোশনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কারসাজিতে এই সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে মনোযোগী না হয়ে ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ টানা প্রায় ২০ দিন নিয়োগ ও প্রমোশন বোর্ড করে যাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের অনেকেই মনে করছে শিক্ষার উন্নয়নের বিষয়ে প্রশাসনের কোন মাথাব্যাথা না থাকলেও নিয়োগে তারা অতি উৎসাহী। নিয়োগ ও প্রমোশনের সাথে জড়িত অনেকের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের সাথে জড়িত সহকারী রেজিস্ট্রার জনাব শাহনেওয়াজ চৌধুরী ও উপ রেজিস্ট্রার জনাব শেখ আল মাসুদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। শাহনেওয়াজ চৌধুরী ও শেখ আল মাসুদ অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে তাদের পূর্ব পরিচিতদের দিয়ে আবেদন করান এবং পরীক্ষার যাবতীয় বিষয় আগেই জানিয়ে দিয়ে চাকুরি পেতে সকল ধরণের সাহায্য করেন। এ দুজন কর্মকর্তা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগের শাহজাদপুর উপজেলার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আব্দুল হামিদ লাভ্লুর শালা (শাহনেওয়াজ চৌধুরী) অন্যজন নিকট আত্মীয় (শেখ আল মাসুদ)। এছাড়াও প্রশাসনে লাভ্লুর ভাইয়ের বউ, ভাতিজা, রাজনৈতিক কর্মীসহ অনেকেই এখনও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছে। এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, জনাব শাহনেওয়াজ চৌধুরীর বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের প্রতারক মামলা রয়েছে, সি.আর মামলা নং-৪০/২০২৬(শাহজাদপুর)। নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক এক শিক্ষক জানান যে, এটি একটি চক্র যারা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে অপকর্ম করে যাচ্ছে।
শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্বে থাকা সহকারী রেজিস্ট্রার জনাবা শিরিন আক্তার ও উপ রেজিস্ট্রার জনাব শেখ আল মাসুদের বিরুদ্ধেও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। শিরিন আক্তারের ভাই ইউজিসির প্রভাবশালী কর্মকর্তা হওয়ায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি চাকরি পান। এমনকি শিরিন আক্তারের স্বামীও একই লবিংয়ে চাকরি পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ-এর ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, ট্রেজারার ড. ফিরোজ আহমেদ যিনি ট্রেজারার পদের বাইরে অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালক, আইকিউএসি বিভাগের পরিচালক পদেরও দায়িত্ব পালন করছেন। ড. ফিরোজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ট্রেজারার ও অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালক হওয়ার কারনে নিয়ম বহিরভুতভাবে সকল কমিটির সদস্য হয়ে মাসে লক্ষাধিক টাকার বেশি সম্মানী গ্রহণ করেন। তিনি আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে চরমভাবে ব্যর্থ। গভীর অনুসন্ধান করলেই দেখা যাবে গত দেড় বছরে তিনি সম্মানী হিসাবে কত টাকা গ্রহণ করেছেন।
প্রো ভাইস চ্যান্সেলর ড. সুমন কান্তি বড়ুয়া তিনিও প্রো ভাইস চ্যান্সেলর পদের পাশাপাশি রেজিস্ট্রার, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কমিটির সদস্য হওয়ায় তিনিও মাসিক সম্মানী তাঁর মূল বেতনের কয়েক গুন বেশি গ্রহণ করেন। সম্মানী গ্রহণ করার জন্য শতশত তদন্ত কমিটি গঠন করে নিজেই সভাপতি থাকেন। উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে তদন্তের নামে কমিটির সভা আহ্বান করে বারবার সম্মানী নেন। এছাড়া প্রশাসনিক কাজ কর্ম ফেলে সারা দিন গড়ে ৮ থেকে ১০ টি সভায় যোগ দেন এবং সম্মানী গ্রহণ করেন। গভীর অনুসন্ধান করলেই দেখা যাবে গত দেড় বছরে তিনি সম্মানী হিসাবে কত টাকা গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মনমানসিকতা যদি এমন হয় যে, তাঁর দায়িত্ব পালন করতে এতএত সম্মানী নিবেন তাহলে জাতি এক গভীর সঙ্কটে রয়েছে।
শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, প্রো ভাইস চ্যান্সেলর ড. সুমন কান্তি বড়ুয়া তাঁর পূর্ব পরিচিতকে সংগীত বিভাগের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। প্রো ভাইস চ্যান্সেলর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এনায়েতপুরে স্থাপিত খাজা ইউনুস বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পরিচিত ড্রাইভার সাইফুলকে চাকরী দিয়েছেন। খাজা ইউনুস বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পরিচিত এক শিক্ষার্থীকে নার্সের চাকুরী দিয়েছেন। প্রো ভাইস চ্যান্সেলর তাঁর পূর্ব পরিচিত তারা মিয়া নামের একজনকে অফিস সহায়ক পদে চাকুরি দিয়েছেন। এছাড়া সুলতান মাহমুদ নামের একজনকে তাঁর ড্রাইভার পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এসকল কর্মকাণ্ডের ফলে, প্রশাসনের অনেকেই মনে করছে চলমান নিয়োগেও প্রো ভাইস চ্যান্সেলর অনৈতিকভাবে তাঁর পূর্ব পরিচিতদের চাকুরি দেবার জন্য তড়িঘড়ি করে জাতীয় নির্বাচন প্রাক্কালের সুযোগ নিচ্ছেন। এবিষয়ে শাহজাদপুরের সচেতন সুধী সমাজ মনে করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের প্রাক্কালে এধরনের গণ নিয়োগ অগ্রহণযোগ্য এবং এ নিয়োগ অতি দ্রুত বাতিল না করলে নিকট ভবিষ্যতে এধরনের নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হবে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর হাসান তালুকদার-কে নিয়োগের অনিয়ম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, সকল নিয়ম মেনেই নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তাঁর সময়কালে বিভিন্ন সময়ের অনিয়মের বিষয়ে কয়েকশত তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক সমাধান হয়েছে এবং বাকিগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। ভিসি, প্রো. ভিসি, ট্রেজারারসহ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অস্বাভাবিক সম্মানী গ্রহণের বিষয়ে তিনি এড়িয়ে যান। জাতীয় নির্বাচন প্রাক্কালের তড়িঘড়ি করে একাডেমিক ও প্রশাসনিক অন্য কাজ ফেলে শুধু নিয়োগের বিষয়ের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় থাকা নৈশ প্রহরী পদে ১০ জনকে অর্থের বিনিময়ে আগে থেকেই নির্বাচিত করার অভিযোগ উঠলে এ বিষয়েও তিনি অস্বীকার করেন।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান ভিসি মহোদয় স্বৈরাচারীর মত একনায়কতন্ত্র কায়েম করে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য দাবি করলে ছাত্রত্ব বাতিল করার হুমকি দেন। ভিসি তাঁর প্রয়োজনে কতিপয় শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করে বাকি সকল শিক্ষার্থীদের ভয় ভীতি দেখান। ভিসির বিপক্ষে গেলেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হয় চাকরীচ্যুত, না হয় ছাত্রত্ব বাতিল করার আদেশ দেন। ভয়ে কেউ কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেনা। ভিসি মহোদয় তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যায়ভাবে কথায় কথায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শাস্তি দেন। অনেকেই মনে করছে ভয়ের ত্রাস কায়েম করে নিয়োগসহ তাঁর যাবতীয় স্বার্থ হাসিল করাই মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া ভিসি মহোদয় সবার দৃষ্টি ভিন্ন খাতে রাখতে সময় সময় একেকটি ঘটনার জন্ম দেন, অপকৌশলের আশ্রয় নেন। ভিসির এলাকা ময়মনসিংয়ের একজনকে সার্কুলারে উল্লেখিত বয়স অতিক্রান্ত হওয়া স্বত্বেও নার্সের চাকরী দিয়ে ইউজিসির আপত্তির মধ্যে পড়েন।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে শাহজাদপুর সংসদীয় আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ড. এম.এ মুহিতকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি হওয়ার কথা ছিল বিশ্বমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণের কোন কার্যক্রম চোখে পরছে না। আমি যদি শাহজাদপুরের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই এবং বিএনপি সরকার গঠন করে তাহলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণ ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আন্তর্জাতিকমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে।