**লালন শাহের আখড়াবাড়িতে ভক্তদের ঢল**
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়িতে ভক্তদের অফুরন্ত ভিড়। গত দুই দশকে এতো লোকের সমাগম আর কখনও দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন বাউল সাধুরা। শুধুমাত্র আখড়াবাড়িতেই নয়, এক কিলোমিটার দূরে গড়াই নদের পাড়েও ভক্তরা রাত কাটিয়েছেন। রাত যত গভীর হতে থাকে, ভক্তদের সংখ্যাও ততই বাড়তে থাকে। আখড়াবাড়ির দু’দিকের রাস্তা থেকেই এক কিলোমিটার দূরে পুলিশ যানবাহন প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
লাখো মানুষের উপস্থিতি আর বাউল সাধুদের মিলনমেলায় মুখরিত আখড়াবাড়ি। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও রাত ১০টা ৩০ মিনিটে তিন দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ফকির লালন শাহ ছিলেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি ১৩৪ বছর আগেই সব রকম বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে গিয়েছেন।
বাউলরা বলছেন, সাঁইজি সব সময়ই শান্তির বার্তা দিয়েছেন। ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে…’। চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী, পয়লা কার্তিক রাতে ‘অধিবাস’ শুরু করেন বাউলরা। সাধুসঙ্গের পর রাতে বাউলরা খিচুড়ি খেয়ে সাঁইজির আরাধনা করেন।
শুক্রবার ভোরে গোষ্ঠগানের মধ্য দিয়ে বাউলদের আচার শুরু হয়। দ্বিতীয় দিন সকালে ‘বাল্যসেবা’ অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বে সকালে অনেক বাউল ‘ভেক গ্রহণ’ করেন। পায়েস মুড়ি খেয়ে গানবাজনা ও তত্ত্ব আলোচনা চলে। দুপুরে ‘পূর্ণসেবা’ হয়। এর মধ্যে আছে সাদা ভাত, মাছ, কলাইয়ের ডাল, সবজি ও দই। বিকেল থেকেই শুরু হয় অবিরাম সঙ্গীতের ধারা। তবে আগের রাতের অবিরাম সঙ্গীতের ক্লান্তিতে অনেক বাউল সাধু রাজঘাটে কালী নদীতে স্নান করতে যান।
কয়েকজন বাউল বলেন, সাঁইজিকে পেতে দু’দিনই যথেষ্ট। তাই তো আত্মার মিলন সব শেষ করে নিজেদের ডেরায় ফিরতে গেলেও তৃষ্ণা থেকেই যায়। যেতে চাইলেও মন বাদ সাধে। ভক্ত সাধু, গুরুর সান্নিধ্য লাভের আশায় আবারও সবাই মিলিত হবেন সাঁইজির দোল উৎসবে।
বাউলরা জানান, গুরু-শিষ্যের মধ্যে প্রকৃত প্রেম জাগে। তারা খুঁজে নেন আত্মার মিলন। পান শান্তির সুখপাখি। প্রকৃতির প্রেমে সাড়া দিয়ে প্রতিবছর এই তিরোধানে আসেন তারা। এবার কুষ্টিয়ার ওপর দিয়ে ঢাকার একাধিক ট্রেনের যোগাযোগ থাকায় গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়েছে। এবার মেলায় কেনাকাটাও অনেক বেশি হচ্ছে।
উদ্বোধনী রাতে তারকা শিল্পী বিউটি, কাঙ্গালিনী সুফিয়া সহ বিভিন্ন শিল্পী গান গেয়ে হাজারো শ্রোতার মন জয় করেছেন। তবে আখড়াবাড়ির মূল এলাকায় বাউলরা তাদের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান অনুযায়ীই করছেন। মেলা প্রাঙ্গণের আশপাশের কার্যক্রম একটু ভিন্ন। সেখানে মূল মঞ্চে গান চলে। পাশেই মেলায় লোকজনের ভিড়ে কেনাকাটা চলছে।
মেলায় আকিক পাথর, আজমেরি সুতা, রুদ্রাক্ষ, শীতলগোটা, কইলজা ফল, নীলগিরি, চক্রমতির মালা, তাবিজ এবং মাদুলি কেনার ভিড়। এর সঙ্গে বাহারি জিলাপি খাওয়ারও প্রচলন রয়েছে। কলাইয়ের রুটির দোকানগুলোতেও সবসময় ভিড় থাকে।
লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এই অনুষ্ঠান আগামীকাল শনিবার সন্ধ্যায় আলোচনা ও রাতে মঞ্চে গানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে। তবে লালন মেলা চলবে আরও কয়েক দিন।