• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৮:৪০ অপরাহ্ন |

চুরির ডাকে মামার আহ্বান

‘কিংবাদন্তিতুল্য যাঁর জনপ্রিয়তা, সেই লেখক হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটকে (সম্ভবত বহুব্রীহি) গৃহ থেকে বিতাড়িত গৃহভৃত্য কাদের নামের চরিত্রটিকে যখন রিকশা চালানোর কথা বলা হয়, তখন তিনি বলেন, ‘মামা সৈয়দবংশ! রিকশা চালামু? মায়েদের দেখে ফালাইব না! ’
মামার প্রশ্ন ‘তো কী করবি?’
‘চুরি করমু’।
শুধু অর্থহীন বংশগরিমা রক্ষায় রিকশা চালানোর চেয়ে চুরি করাকে শ্রেয় মনে করছে কেউ আর কেউ সংস্কৃতজাত মানসিক দ্বিধায় সামান্য কাজ করাকে অবজ্ঞা করছে, ভীতচোখে দেখছে।
সুস্মি (সুসমা) এই দেশে এসেছে ১০ সপ্তাহ হয়নি। এরই মাঝে ট্রেনে চড়ে অফিসে যাওয়ায় অভ্যস্ত হচ্ছে। দুবাইতে সুস্মির বাচ্চা রাখার লোক ছিল; যাকে গভর্নেস বলা যায়। তার কাছে নিশ্চিন্তে বাচ্চা রেখে সে গাড়িতে চড়ে অফিসে যেত। ভারতে ট্রামে–বাসে কখনো–বা রিকশায় চড়ে কলেজ ও ইউনিতে গেছে। আর এই দেশে গভর্নেস তো দূরের কথা, একটা আয়াও নেই! আর থাকলেও তা সাধ্যের বাইরে। শহরে গাড়ি নিয়ে আসাও মুশকিল। কারণ, গাড়ির পার্কিং সীমিত। তাই ভোরবেলাই বাচ্চাসহ ট্রেন ধরা। বাচ্চাকে চাইল্ডকেয়ার সেন্টারে নামিয়ে দিয়ে তবে অফিসে পৌঁছানো। তাই প্রতিদিন কিছুটা সময় হাতে নিয়ে বের হতে হয়। মিনিট দশেক সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে মানুষের যাতায়াত দেখে আর ভাবে। কত কী ভাবে। জীবন কোথাও চূড়ান্ত নিশ্চিত নয়—এই অমোঘ সত্য ধরা দেয় চেতনায়।
আজ দেখে, এক মহিলা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে এক প্যাকেট চকলেট। যে যাচ্ছে তাকে একটা করে চকোলেট দিচ্ছেন। সুস্মি ভিড় কমলে মহিলার কাছে গিয়ে জানতে চাইল কীসের জন্য চকলেট বিলানো হচ্ছে। মহিলা চোখে পানি নিয়ে বলল, তার ছেলে আজ ফিশ অ্যান্ড চিপসের দোকানে কাজ শুরু করেছে, সেই আনন্দে তিনি চকোলেট বিলাচ্ছেন। ছেলের বয়স কত জানতে চেয়ে সুস্মি অবাক। ১৭ বছরের ছেলে এখনই আগুনের কাছে রান্নাবান্নার কাজ করতে যাবে, সেই আনন্দে মা অপরিচিত মানুষকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন! এ কোন আজব দেশে এসে পড়ল!
সুস্মি প্রামে বসা ছেলে কৃষের দিকে তাকাল। মনে মনে প্রার্থনা করল, তার ছেলেকে যেন কোনো দিন ফিশ অ্যান্ড চিপসের দোকানে কাজ করতে না হয়। তার আদরের কৃষ্ণ এখানে হয়ে গেছে কৃষ। এ দেশে ক্রিস্টোফারকে সংক্ষেপে ক্রিস বলে। কৃষ বা কৃষ্ণের জীবন যেন তার নিজের জীবনের চেয়েও ভালো ও মসৃণ হয়, সেই আশাতেই তো এই দেশে আসা। দুবাইতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে ভালো চাকরি ছিল তার, স্বামীও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার।
অস্ট্রেলিয়ায় রেসিডেন্সির জন্য চেষ্টার পাশাপাশি চাকরির জন্যও বিভিন্ন সংস্থায় আবেদন পাঠিয়েছিল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, তাই দুটিই একসঙ্গে হয়ে গেল। অর্থবিত্ত তাদের যথেষ্ট আছে। তবুও আসার পর থেকে বারবার মনে হচ্ছে, শুধু অর্থ থাকলেই ভারত বা দুবাইয়ের মতো স্বাচ্ছন্দ্য এখানে মেলে না। আজকের এই ঘটনা তাকে ভাবিয়ে তুলল খুব। দুপুরে লাঞ্চ খাওয়ার সময় বাংলাদেশের সহকর্মী রায়া আলীকে ঘটনাটা বলে সুস্মি। সে বয়সে সুস্মির চেয়ে বড়, তার স্কুল– কলেজপড়ুয়া সন্তানও রয়েছে। মাঝারি লম্বার চিকন গড়নের নম্র গম্ভীর মহিলাকে ভাবুক মনে হয়। সুস্মি জানতে চাইল, তার মতো ভাবনা কি একেও দোলা দিয়ে গেছে কখনো! সব শুনে সুস্মিকে রায়া আশ্বস্ত করে বলে যে এই দেশে নিয়মই হচ্ছে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চারা কিছু কিছু কাজ করে বড় হয়। এদের মতে দায়িত্বশীল হয়ে বড় হওয়ার জন্য কাজ করাটা দরকার। সব শুনে সুস্মির বিস্মিত প্রশ্ন, ‘ছোটবেলা মানে কত ছোট? ’
‘এই যেমন ইয়ার টেন বা গ্রেড টেনে পড়ার সময়ে স্কুলের পাঠের অংশ হচ্ছে ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স অর্জন করা।’
‘তোমার বাচ্চারাও কি করেছিল?’
রায়া নিজের অভিজ্ঞতা তখন বর্ণনা করে।
তারও আছে দুই ছেলে। বড়জন ইয়ার টেনে থাকার সময়ে এক ইলেকট্রনিকের দোকানে কাজ করেছিল ১০ দিন। পয়সাও পেয়েছিল সামান্য। ইয়ার ইলেভেনে পড়ার সময়ে এক ছুটির দিনে সকালে নাশতার টেবিলে ঘোষণা করল, ‘আমি উইকএন্ডে কয়েক ঘণ্টা কাজ করব। দেখি কি কাজ পাই।’ রায়া ও তার স্বামী আঁতকে উঠল ছেলের কথা শুনে। তাদের আয়–উপার্জন ভালো। ছেলেদের চাহিদাও মিটিয়ে যায় দরাজ হাতে। দুই ছেলের জন্য এডুকেশন ইনস্যুরেন্স বা শিক্ষাবিমার জন্য প্রতিমাসে মোটা টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে যাচ্ছে। আর ছেলে চায় কাজ করতে! ওর মাথায় গোলমাল দেখা দেয়নি তো? নাকি বাজে সঙ্গীসাথি জুটেছে, তাই বাড়ি ছাড়ার মতলব করেছে? ভয় হলো তাদের। তবে অবস্থা দেখে ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *