“পাবলো পিক্যাসো: আজও সময়োপযোগী”
যখন আমরা পাবলো পিকাসোর নাম শুনি, তখন তাঁর ‘গার্নিকা’ প্রথমেই আমাদের মনে আসে। এটি যুদ্ধে আহত হওয়া মানুষের কান্নাকে, দুর্ভোগকে এবং যুদ্ধের বীভৎসতার চিত্রকে প্রতিফলিত করে। কেউ তাকে কমিউনিস্ট বলে, আবার কেউ বুর্জোয়াদের পোষা বলে; পিকাসো ছিলেন একটা ধোঁয়াটে চরিত্র। তিনি নিজের আঁকা ছবির মতোই বহু রহস্যে আচ্ছন্ন থাকতেন, তাই জীবদ্দশাতেই তিনি একটি কল্পকাহিনী এবং রহস্যে পরিণত হয়েছিলেন। তবে শিল্পপ্রেমীদের কাছে, তাঁর এই রহস্যাবৃততা বা বাস্তবিকতা কোনটাই খুব একটা গুরুত্ববহ নয়।
১৯৭৩ সালের ৮ এপ্রিল, কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো মারা যান। তার আগের বছর, অর্থাৎ ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মাসিক সাহিত্য সাময়িকী, “গণসাহিত্য” প্রকাশ শুরু হয়; সম্পাদক আবুল হাসনাত। উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন শামসুর রহমান, আনিসুজ্জামান, কায়ুম চৌধুরী, মফিদুল হক, মতিউর রহমানসহ আরও অনেকে। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর আলোকপাতকারী এই সাময়িকীর প্রকাশ বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। এই সাময়িকীতে একগুচ্ছ তরুণ কবি, লেখক এবং শিল্পীরা এসে জড়ো হন। ষাটের দশকের শুরু থেকেই, তারা রাজনীতির পাশাপাশি গান, সাহিত্য, এবং শিল্পচর্চায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। দুই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে, তাদের প্রগতিশীল কবি, লেখক এবং শিল্পীদের প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহ ছিল। বিশ্বের সেরা কবিতা তাদের অনুপ্রাণিত করে, গান তাদের মোহিত করে, অভিনয় তাদের আকর্ষিত করে, এবং বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা ছবি তাদের রোমাঞ্চিত করে। কোথাও কোনো ছবি প্রদর্শনীর খবর পেলেই, তারা দল বেঁধে সেখানে ছবি দেখতে যেতেন। সম্ভব হলে, কেউ কেউ তাদের পছন্দের ছবির প্রতিলিপিও সংগ্রহ করতেন। তাই পৃথিবী বিখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী এবং ভাস্কর পাবলো পিক্যাসো যে তাদের পছন্দের শিল্পীদের তালিকায় থাকবে, তা স্বাভাবিকই। বিশেষ করে, সামরিক শাসন বিরোধী তীব্র ছাত্র আন্দোলনের সময় এবং স্বাধীনতার পরপরই, স্পেনের এই চিত্রশিল্পী ওই তরুণ প্রজন্মের কাছে গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিলেন। তাই, তার মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, শোকাহত তরুণদের মনে আসে, তার স্মরণে “গণসাহিত্য”-এর একটি স্মারক সংখ্যা প্রকাশ করার। তারা সত্যিই তা-ই করেছেন। অত্যন্ত যতœ নিয়েই করেছেন।
“গণসাহিত্য”-এর এই স্মারক সংখ্যায়, রণেশ দাশগুপ্ত, ইলিয়া এরেনবুর্গ, বিষ্ণু দে, রশিদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, সন্তোষ গুপ্ত, শামসুর রহমান, রফিকুন নবী, মতিউর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, মুনতাসীর মামুন এবং আখতার হুসেন পিক্যাসো সম্পর্কে রচনা লিখেছেন। এই ছোট-বড়, মাঝারি মাপের রচনাগুলোর কেউ কেউ পিক্যাসোর জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছেন, আবার কেউ কেউ তার জীবনের নির্দিষ্ট কোনো দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন। কেউ তার শিল্পকর্মের বর্ণনা দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ বিশ্লেষণ করেছেন।
এই মাসেই, কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী পিক্যাসোর জন্মদিন উপলক্ষে, প্যারিসে থাকার সময় পিক্যাসোর ছবি তৎকালীন কবিদের কবিতাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল বা সেই কবিদের কবিতা এবং অন্য লেখাগুলোতে পিক্যাসোর চিত্রকলার উপস্থিতি কেমন ছিল, এমন বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। “গার্নিকা” আঁকা, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের সঙ্গে পিক্যাসোর যোগাযোগ বা ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে সারা বিশ্বে তুমুল হইচই ফেলে দেওয়া, তার আঁকা “শান্তির কবুতর” শান্তি আন্দোলনের একটি প্রতীকে পরিণত হওয়া—এই সব বিষয়গুলোর সঙ্গে সেই চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের তার ব্যাপক কর্মকাণ্ড আমাদেরকে অনেকখানি অনুপ্রাণিত করেছে।
এই সংখ্যায়, পিক্যাসোকে নিয়ে কবি পল এলুয়ার এবং রাফায়েল আলবের্টির দুটি কবিতা অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ হলো, “জেনারেল ফ্রাঙ্কোর দুঃস্বপ্ন” শিরোনামে পিক্যাসোর নিজের একটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৩৭ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধে জেনারেল ফ্রাঙ্কো এবং তার ফ্যাসিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী স্পেন সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পিক্যাসো। গণহত্যাকারী জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বজনেতার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তিনি “ফ্রাঙ্কোর স্বপ্ন এবং মিথ্যা” নামে একটি প্লেটে কিছু এচিং করেছিলেন। এই ছবিগুলোর ভূমিকা হিসেবেই এই কবিতাটি তিনি লিখেছেন।
ফ্যাসিস্ট এবং খুনি সরকারের বিরুদ্ধে পিক্যাসো ছিলেন অনমন এবং বর