• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০২:৪৩ অপরাহ্ন |

কৃষি প্রকৌশলীদের টেকনিক্যাল ক্যাডার দাবি এখন সময়ের

**কৃষি প্রকৌশলীদের টেকনিক্যাল ক্যাডার**

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হলো কৃষি। আর কৃষির উন্নতির জন্য প্রযুক্তি আর যন্ত্রপাতির ভূমিকা অপরিসীম। কৃষি প্রকৌশলীরা এই যান্ত্রিকীকরণ আর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কাজে বড় অবদান রাখেন। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পরও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে তাদের টেকনিক্যাল ক্যাডারের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এই বৈষম্য দূর করা এখন জরুরি।

স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি প্রযুক্তির উন্নতি আর উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষি প্রকৌশলীরা কাজ করে যাচ্ছেন। বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রকল্প আর বিএডিসির মাধ্যমে সেচব্যবস্থার উন্নতিতে তাদের ভূমিকা অগ্রণী। তবে এই দক্ষ প্রকৌশলীরা সরকারি চাকরিতে এখনও টেকনিক্যাল ক্যাডারের অধিকার থেকে বঞ্চিত। এটি শুধু তাদের জন্যই বৈষম্য নয়, দেশের কৃষি খাতের জন্যও বাধা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এই দেশের অন্যতম প্রধান কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পরে ১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ যুক্ত হয়। সেই থেকে প্রতি বছর বিএসসি কৃষি প্রকৌশল ডিগ্রি নিয়ে মেধাবী প্রকৌশলীরা এই অনুষদ থেকে স্নাতক হয়ে দেশের কৃষি খাতে অবদান রাখছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে টেকনিক্যাল ক্যাডারের অভাবে তাদের শেখা জ্ঞান আর দক্ষতা পুরোপুরি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন না। এই বৈষম্য দ্রুত দূর করা হোক।

বর্তমানে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কার শুরু হয়েছে। বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে সরকারও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। কৃষি প্রকৌশলীদের জন্য টেকনিক্যাল ক্যাডার চালু করাও এখন সময়ের দাবি। ২০২৪ সালের এই আন্দোলন জাতীয় উন্নয়ন আর সমতার দিকে একটি নতুন দিশা দেখিয়েছে। এই সংস্কারের অংশ হিসাবে কৃষি প্রকৌশলীদের জন্য টেকনিক্যাল ক্যাডার চালু করা উচিত। তাহলেই তারা তাদের মেধা আর দক্ষতা দেশের সেবায় পুরোপুরি নিয়োগ করতে পারবেন।

কৃষি প্রকৌশলীদের সরকারি স্বীকৃতি না দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত বঞ্চনার বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় সম্পদ অপচয় করে ফেলছে। একদিকে সরকারের টাকায় কৃষি প্রকৌশলী তৈরি করা হচ্ছে, আবার অন্যদিকে তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। টেকনিক্যাল ক্যাডার চালু করা হলে তারা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ, উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন।

কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার সুযোগ করে দিয়েছিল। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টারের মতো যন্ত্রপাতি ভর্তুকি মূল্যে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত বড় প্রকল্পেও কৃষি প্রকৌশলীদের কোনো ভূমিকা রাখা হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশিরভাগ যন্ত্রই খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষি প্রকৌশলীরা এই যান্ত্রিকীকরণের মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করতে পারেন। তারা যন্ত্রপাতিগুলোর সঠিক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, কৃষকদের যন্ত্রপাতি ব্যবহার আর রক্ষণাবেক্ষণের সঠিক পদ্ধতি শেখাতে পারেন। ফলে ফসলের উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু তাদের এই কাজে না জড়ানোর ফলে দেশ প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে না।

বর্তমান সময় প্রযুক্তির যুগ। কৃষির উন্নয়নও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের কৃষি খাতকে উন্নত করতে হলে কৃষি প্রকৌশলীদের গুরুত্ব দিতেই হবে। জমি তৈরি করা থেকে শুরু করে সেচ, ফসল সংগ্রহ আর সংরক্ষণ সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন কৃষি প্রকৌশলীরা।

কৃষি প্রকৌশলীদের টেকনিক্যাল ক্যাডার চালু না করলে তাদের মেধা আর দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন করা যাবে না। টেকনিক্যাল ক্যাডার চালু করা হলে তারা মাঠে সরাসরি কৃষকদের সাথে কাজ করতে পারবেন এবং দেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারবেন। এতে শুধু কৃষি খাতই নয়, পুরো অর্থনীতিই লাভবান হবে।

অতএব, দেশের সব খাতে বৈষম্য দূর করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তার ধারাবাহিকতায় কৃষি প্রকৌশলীদের জন্যও টেকনিক্যাল ক্যাডার চালু করা এখন সময়ের দাবি। কৃষি প্রকৌশলীদের সঠিক মূল্যায়ন করা হোক এবং তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো হোক। তবেই দেশের কৃষি খাতকে আধুনিক, লাভজনক আর টেকসই করা সম্ভব হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *