• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৭:২৭ অপরাহ্ন |

স্মরণে নাট্যজন জামালউদ্দিন হোসেন

সম্মানিত পাঠক,
২০১৪ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসি। তার আগে প্রায় সাড়ে ছয় বছর আমি যুক্তরাজ্যে কাটিয়েছিলাম। এত দীর্ঘ সময় আমি বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশে ফিরে আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম! ২০০৬ সালের আগে দেশে থাকার সময় আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ক্যামেরা নিয়ে যেতাম, এমনকি হরতাল, আন্দোলন এবং মিছিলেও যোগ দিতাম। এরপর বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখিও করতাম। তাই প্রবাস জীবন আমার কাছে কঠিন ছিল। কারণ, আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে খুব মিস করতাম। ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি (বিশ্ব ভালোবাসা দিবস/ভ্যালেন্টাইন ডে) আমার বাংলাদেশ থেকে আবারো দূরত্ব বাড়লো। সেই বছরের শুরুর দিকে ঢাকায় বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলায় আমি বেশ কয়েকবার ঘুরেছি। বইমেলা চত্বরে ক্যামেরায় ছবি তুলেছি। বই পড়েছি। কিছু বই সংগ্রহও করেছি। এছাড়াও ঘুরে ঘুরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানের ও মানুষের ছবি তুলেছি। কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু কারণে সেই সময় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত নাটক ও সংগীতের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ আমার হয়নি। এমনকি যুক্তরাজ্যে থাকার সময়ও সেখানকার বাংলাদেশিদের কোনো অনুষ্ঠানে আমি অংশ নিতে পারিনি।

আমেরিকায় এসে আমি পরিবার নিয়ে নিউইয়র্কের ব্রংকসে বসবাস শুরু করি। ব্রংকস থেকে নিউইয়র্কের ডাউনটাউনে বাঙালিদের বসত এলাকা জ্যামাইকা এবং জ্যাকসন হাইটসে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। বাংলাদেশিদের আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। ২০১৪ সালের ১৫ জুন আমার মেয়ে শবনম অদিতিকে নিয়ে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন-নিউইয়র্ক আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা-২০১৪’-তে গিয়েছি।

সেবার নিউইয়র্ক বইমেলায় গিয়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম! এ যেন এখানে একটুকরো বাংলাদেশ! বইমেলার বাইরে আমেরিকার এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা লাগানো ছিল। এই দৃশ্য আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছিল! আমাদের হৃদয় এবং মন পূর্ণ হয়েছিল। উৎসাহ নিয়ে দরজা পেরিয়ে আমি ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম, অসংখ্য বাংলা বইয়ের বর্ণিল দোকান সেখানে! রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, আলবার্ট ক্যামুস, জীবনানন্দ, হুমায়ূন আহমেদ… এত আলোকিত মানুষের অভিজ্ঞতার সমাহার! একজন ব্যক্তিকে দেখলাম, তিনি ব্যস্তভাবে ছুটোছুটি করছেন। পরে জানতে পারলাম, তিনি মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা। দেখলাম, চ্যানেল আই এর পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরকে। তার ছবি তুললাম। আবার দেখলাম কবি মহাদেব সাহা এবং নাট্যাভিনেত্রী লুৎফুন নাহার লতাকে। তাদের সঙ্গেও ছবি তুললাম। এরপর দেখলাম আমার প্রিয় নাট্যজন জামালউদ্দিন হোসেন এবং তার স্ত্রী রওশন আরা হোসেনকে। আমরা দুজনে তাদের সালাম দিলাম। তারাও হাসিমুখে আমাদের সালাম ফিরিয়ে দিলেন। দেখলাম, জামালউদ্দিন সাহেবের বুকে একটি ব্যাজ ঝুলছে। আমি বুঝলাম, তিনি বইমেলার সফলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করছেন। এই বিষয়টি আমার অনেক ভালো লেগেছে। দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় এই নাট্যজন দেশ ছাড়লেও দেশ তাকে ছাড়েনি! সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেননি! তাঁর পক্ষে তা করা সম্ভব নয়! এটিই আসলে একজন শিল্পীর দেশ এবং শিল্পকে ভালোবাসার পরিচয়।

আমি জামালউদ্দিন সাহেবকে বললাম, ‘স্যার, আপনাদের সঙ্গে ছবি তুলব?’ তিনি হালকা হেসে বললেন, ‘বলুন তো!’ এরপর স্বামী-স্ত্রী দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পোজ দিলেন! শবনমও তাদের গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। আমি তাদের তিনজনের ছবি তুললাম। এরপর শবনমের হাতে ক্যামেরা দিয়ে আমিও তাদের পাশে দাঁড়ালাম। শবনম আমাদের ছবি তুললো। এখন সেই দুটি ছবি আমার মনের মণিকোঠায় স্মৃতি হয়ে গেছে! বেদনার মধ্যে ইচ্ছে করলেই যেকোনো সময় আমি সেগুলো দেখে তাদের সঙ্গে আমাদের উষ্ণ সান্নিধ্যর অনুভব করি।

সেদিন সেই বইমেলায় জানতে পারলাম, জামালউদ্দিন দম্পতি দেশের বাইরে থাকেন। সময়-সুযোগ পেলে দুজনেই দেশে আসেন। তবে তারা সেখানে নিয়মিত থাকেন না। তাই ক্যামেরার সামনে এবং নাট্যমঞ্চে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিতে পারছেন না তারা! তাদের দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে পারছেন না, তাদের নিজেদের আলো ছড়াতে পারছেন না! মনে হলো, এখন তাদের অসংখ্য ভক্ত তাদের রুপালি পর্দায় এবং টেলিভিশন নাটকে আর নিয়মিত দেখতে পান না। এই বিষয়টি নিশ্চয় এই দুই গুণী ব্যক্তিরও সান্ত্বনাদায়ক নয়।

কি আর করা! জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের সবারই মানিয়ে নিতে হয়। আমরা দেখেছি, লুৎফুন নাহার লতাকেও। তার কথাও জানলাম। তিনিও দেশে একজন দর্শকদের পছন্দের নাট্যাভিনে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *