পরীমনির জীবন একটা সিনেমার গল্পের মতোই। হাসির সাথে কান্নার সমন্বয়ে সাজানো এই জীবনে কতো না কাহিনী লুকিয়ে আছে!
একবারের কথা, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার দেওয়ার অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় পুরস্কার না পাওয়াতে পরী খুব কান্না করছিলেন। আচমকা ঘোষণা হলো যে, তিনিই বিশেষ সমালোচক পুরস্কারটি পেয়েছেন। কান্না মুছতে মুছতে মঞ্চে উঠে তিনি বরেণ্য অভিনেত্রী কবরী দিদির হাত থেকে পুরস্কারটি নিলে কবরী দিদি বললেন, "পরীর কাঁদতে নেই।" পরী কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, "আমি তো ডানাকাটা পরী।"
কিছুকাল পরে, কলকাতার বিমানবন্দরেও পরীকে কাঁদতে দেখা গেলো। কর্মকর্তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন কারণ পরী ঢাকায় আনার জন্য একটি ফুটবল কিনেছিলেন। কিন্তু কলকাতা থেকে ফেরার সময় সেটা প্লেনে উঠতে দেবে না কর্মকর্তারা। শেষমেশ হাওয়া বের করে চ্যাপ্টা বলটি বাংলাদেশে এলো পরীর সাথে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সার্চ দিলে দেখা যাবে পরীর কান্নার অনেক ভিডিও। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি অঝরে কেঁদেছেন। কেঁদেছেন সংবাদ সম্মেলনেও। তবে পরীর কান্নার লোনাজলেও যেন হাসিটাই লুকিয়ে আছে। ফেসবুকে পরীর হাসিমুখের জয়জয়কার। আজ বৃহস্পতিবার তার জন্মদিন। তিনি নেটিজেনদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার এক কোটি ছয় লাখ ভক্তদের সাথে কেক কেটেছেন।
পরীর গল্প কে না জানে? যে গল্পে রয়েছে এত হাসি-কান্না। মন চায় নাচ করেন। মন চায় কান্নার সুরে গুনগুন করেন। মন চায় সেজেগুজে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়েন। আজ ঢাকা, কাল পিরোজপুর, পরশু কক্সবাজার কিংবা কলকাতা! মন চায় এর ওপর, তার ওপর রাগ ঝাড়েন। রান্না করেন। সন্তানের ছবি তুলে ফেসবুকে দেন।
পরীর গল্পটা শুরু হয়েছে ১৯৯২ সালের ২৪ অক্টোবর। সাতক্ষীরায় তার জন্ম। আসল নাম শামসুন্নাহার স্মৃতি। তিন বছর বয়সেই মা মারা যাওয়ায় তিনি নানা-নানীর কাছে বড় হন। গত বছর সুযোগ্য সেই নানাও পরীকে ছেড়ে চলে গেছেন বার্ধক্যজনিত কারণে।
এরপর থেকেই পরী সন্তানকে নিয়ে নিজের সংসার শুরু করেন। ২০১১ সালে নাচ শিখতে বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসে (বাফা) ভর্তি হন পরী। সেই সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচতেন। একসময় তিনি টিভি নাটকে অভিনয় করার সুযোগও পান। কয়েকটি সিরিয়ালের পরে ‘নারী ও নবনীতা তোমার জন্য’ নামের নাটকে মূল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মন কেড়ে নেন। ২০১৫ সালে ‘রানা প্লাজা’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে সিনেমার নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন পরীমনি।
এরপর কেটে গেছে প্রায় ১০ বছর। এই দশকে তিনি অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন। কলকাতাতেও অভিনয় করেছেন। ‘স্বপ্নজাল’ সিনেমায় তার অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়েছে। গিয়াস উদ্দিন সেলিমের পরিচালনায় নির্মিত সেই সিনেমায় তিনি ‘শুভ্রা’ চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করে দেখিয়েছেন যে একজন অভিজ্ঞ পরিচালকের নির্দেশনায় তিনি নিজের সেরাটা দিতে পারেন। ‘গুণিন’ সিনেমাতেও এই একই পরিচালকের অধীনে কাজ করে তিনি দর্শকদের মন জয় করেছেন। ওয়েব সিরিজেও তিনি কাজ করেছেন। তার অভিনীত ‘রঙিলা কিতাব’ মুক্তি পাচ্ছে আগামী ৮ নভেম্বর।
নাচ, নাটক, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে যতটা না আলোচিত, তার চেয়ে পর্দার বাইরের উপস্থিতি নিয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন পরী। এক হাতে বন্দুক, অন্য হাতে পরীমনি – এই ছবিটা মানুষের কাছে খুব পরিচিত। ফোর্বসের ১০০ ডিজিটাল তারকার তালিকায়ও ছিল পরীর নাম। একসময় তিনি মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তার জন্মদিন উদযাপনও করেছিলেন। সড়কদ্বীপে তাঁর গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরদিন সন্ধ্যায় সাড়ে তিন কোটি টাকার নতুন গাড়ি দেখা গিয়েছিল তাঁর গ্যারেজে। কখনও জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে জন্মদিন উদযাপন করেন তিনি, আবার এফডিসিতে গিয়ে দরিদ্র সহকর্মীদের জন্য খাবার বিল দেন। তার অনুসারীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, এমনকি দেশের সেরা ক্রিকেটারকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিবাহবিচ্ছেদের এক বছর পূর্তিতে ফেসবুকে পরী লিখেছেন, "আমি দেখতে পাই একজন পরিপূর্ণ সুখী মানুষকে। এই জীবনে কষ্ট থাকুক। সেটা কেবল বড় হওয়ার কষ্ট। আমি সেই কষ্টটা আনন্দ নিয়েই করতে চাই। অন্যের ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট পেতে দেব না আর নিজেকে আমি।" পরীর ভাষ্যে, "জীবনটা পুড়ে পুড়ে আজ এই জায়গায় এসেছি। ব্যর্থতা আমাকে আটকাতে পারেনি। সত্যি আমি আজ সুখী।"