আমি যশোরে স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়তাম। সেদিন সেখানে একটা ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ব্যান্ডসটাফের ছোট একটা ক্লাসে অনুষ্ঠানের রিহার্সল চলছিল।
আমি ভাবছিলাম আমিই সবচেয়ে শেষে এসেছি। কিন্তু পেছন ফিরে দেখি আমার পেছনে আরেকটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। বসার জায়গা না দেখে আমি একটা ধুলামাখা বেঞ্চে বসে পড়ি।
ওই মেয়েটির বসার জায়গা হচ্ছে না। আমি তারে ovali বসতে বলব কিনা ভাবছিলাম। কিন্তু সে কি মনে করবে ভেবে পাচ্ছিলাম না। অনেকটা ভেবেচিন্তে বললাম, আপনি চাইলে আমার পাশে বসতে পারেন।
আমি বলার পরেই সে আমার পাশে বসল। সে একটা ধন্যবাদও দিল না। সে আমার সাথে কিছু বলল না। তবে আমি মনে মনে কথা বলছিলাম আর ও আমার দিকে আড়চোখে দেখছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সে দেখছে। তাই কয়েকবার আমাদের চোখাচোখি হলো। আমার পাশে বসে ও গোটা রিহার্সল দেখল।
অনুষ্ঠান শেষে আমরা রিকশার জন্য দাঁড়ালাম। রিকশা পাওয়া অনেক কষ্ট। অবশেষে একটা রিকশা এলো। আমি তাকে ডাক দিলাম এবং সে থামলো। পেছন থেকে দেখি সেই মেয়েটিও আমাকে ডাকছে।
আমি আগে ডেকেছিলাম বলে রিকশাটি আমি পেয়ে গেলাম। মেয়েটি হতাশভাবে দাঁড়িয়ে রইল। সত্যিই হতাশ হওয়ারই কারণ আছে। এ সময় রিকশা পাওয়া অনেক কঠিন।
একটা বিস্ময়কর কথা সে আমাকে বলল। সে বলল, সজীব ভাইয়া, আপনার সাথে আমি যেতে পারব কি? আমি তার মুখে আমার নাম শুনে অবাক হয়ে গেলাম।
আপনি আমাকে চিনেন?
চেনার তো কী আছে। আপনারা তিনতলায় থাকেন। আমরা নতুন এসেছি। আপনি আমাকে চিনবেন কীভাবে? আপনি সারাক্ষণ বই নিয়ে নিজের ঘরে বসে থাকেন।
আচ্ছা, আপনি বসেন। আমি তাকে আমার পাশে বসানোর জন্য জায়গা করে দিলাম। সে আমার সাথে বাসায় গেল।
আমি সেই মেয়েটির কথা বলছি। তার নাম সুমি। সে এখন নবম শ্রেণীতে পড়ে। সে গত মাসে আমাদের বাসায় এসেছে। আগে সে এখান থেকে একটু দূরে থাকত।
আমি ছোটবেলা থেকেই ঘরকুনো। আমার ঘরটাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। তাই আমার মা আমার খাবার রুমেই নিয়ে আসে। আমাদের নতুন ভাড়াটে কে এসেছে, কে গেছে, আমি জানি না।
সেই ঘটনার পর থেকে সে প্রায় আমার সাথে কলেজে আসা-যাওয়া করত। সে আমাদের বাসায়ও বেশি আসত। সুমি আমার মাকে অনেক সাহায্য করত। আমার মা তাকে অনেক ভালোবাসে।
শীতকালে আমি চিতই পিঠা খেতে খুব পছন্দ করি। তবে আমি দুইটার বেশি খেতে পারি না। সেদিন সুমি আমার ঘরে রেখে যাওয়া দুইটা পিঠার মধ্যে একটা খেয়ে ফেলে। আমি মাকে জিজ্ঞাসা করলাম একটা কেন? মা বলল, আমি দুইটা রেখেছিলাম। একটা সুমি এসে খেয়ে গেছে।
আমি দেখলাম মেয়েটি আমার খাবারেও ভাগ বসাচ্ছে।
আমি সবচেয়ে অবাক হলাম যখন শুনলাম যে আমার রুমে এসে সে আমার অনুপস্থিতিতে আমার ল্যাপটপ, বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে।
এইচএসসি পরীক্ষার পর আমি সেনাবাহিনীতে চাকরি পেলাম। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে গেলাম ট্রেনিংয়ে। আমার মা একা হয়ে গেলেন। সুমি আমার মায়ের একমাত্র সঙ্গী হলো।
ট্রেনিংয়ের সময় একদিন আমার মা ফোন ধরলেন।
আন্টির শরীর খারাপ। তাই আমি রান্না করছি। আংকেল এখনও বাসায় আসেননি।
সুমি আমার মায়ের খেয়াল রাখবেন।
আপনি আবার আমাকে খোঁচা দিবেন না তো যে আপনার মায়ের ওপর ভাগ বসাচ্ছি?
না, দেব না।
আমার মা যখন আমার সাথে কথা বলেন, তখন শুধু সুমির কথাই বলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম সুমি আমার মায়ের ভাগটাও নিয়ে নিয়েছে।
এই তো এক বছর আগের কথা। তখন আমি রাঙামাটিতে ছিলাম। হঠাৎ আমার খবর পেলাম যে আমার মা অসুস্থ। সিও থেকে ছুটি নিয়ে আমি বাসায় ফিরে এলাম। আমি বাসায় যাওয়ার আগেই জানতে পারলাম আমার মাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একটি ছোট অপারেশন করা হয়েছে। আমি এসব কিছুই জানতাম না। কারণ আমাকে কেউ কিছু জানায়নি।
অপারেশনের পর আমার মা খুব দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাকে সামলাতে একজন লোকের প্রয়োজন। সুমির এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। তাই সে অবসর পেয়েছে। তাই সে আমার মাকে দেখাশোনা করছে।
আমার বিয়েটা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। আমার জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। আমার মা সবসময় আমাকে সুমির কথাই বলছেন। শেষ পর্যন্ত আমি সব কিছুতেই ভাগ বসানো মেয়েটিকেই আমার সব কিছুতে ভাগ বসানোর জন্য বেছে নিলাম।
বাসর রাতে আমি সুমিকে প্রথম যা বললাম জানেন?
মেয়ে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার জীবনেও ভাগ বসালে? তবে একটা জিনিসে শুধু তুমি কেন, কেউই ভাগ বসাতে পারবে না। সেটা হচ্ছে আমার তোমার প্রতি ভালোবাসা। সুমি ঘোমটাটা একটু সরিয়ে বলল, আমারও।
আমাদের দুজনের ভালোবাসা চলতেই থাকবে। আমার মাও তাকে অনেক ভালোবাসে। আমরা সবাই মিলে সুখী হয়ে