প্রবালের লেখালেখি চলাকালীন সময়ে আমার চলছিলো রাইটার্স ব্লক। শত চেষ্টা করেও একটা লাইন লিখতে পারছিলাম না। লেখা ছেড়ে পড়া শুরু করলাম। প্রায় সব পত্রিকার সব ধরণের গল্প, প্রবন্ধ পড়লাম। বিশেষ করে নতুন লেখকদের লেখা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। একদিন তরুণ এক লেখক-বন্ধু আমাকে ফোন করে বলল, কী ব্যাপার, এতদিন তো আপনার লেখা দেখি না?
বললাম, লেখা আপাতত বন্ধ। আসলে লিখতে পারছি না। সে অবাক হয়ে বলল, বলেন কী! এমন কি হতে পারে? আমি বললাম, হ্যাঁ অবশ্যই হতে পারে। একে ইংরেজিতে বলে রাইটার্স ব্লক। তবে আমি যেহেতু তেমন লেখক নই, তাই আমার ক্ষেত্রে হয়েছে ব্রেন ব্লক। সে বলল, এ আবার কী?
বললাম, আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে যে অল্প জ্ঞান সঞ্চয় হয়েছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। তাই লেখা বের হচ্ছে না। সে বলল, আসল ঘটনা কী?
বললাম, ঘটনা সত্য, রিলিফ পাওয়ার যোগ্য। সে বলল, রিলিফ পাওয়ার যোগ্য মানে?
আমি হেসে বললাম, তাহলে তোমাকে একটি মজার ঘটনা বলি: বন্যার সময় অনুদানের জন্য সবাই গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর দরখাস্ত করত, যাতে ত্রাণ পেতে সুবিধা হয়। এত লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর এত বেশি দরখাস্ত পড়েছে যে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে গেল। তিনি সংক্ষেপে একটি কথা লেখা শুরু করলেন, ঘটনা সত্য, রিলিফ পাওয়ার যোগ্য। ত্রাণের দরখাস্তের সাথে একটি দরখাস্ত এল ছেলেকে এলাকার কলেজে ভর্তি করার জন্য। তিনি সেখানেও লিখে দিলেন, ঘটনা সত্য, রিলিফ পাওয়ার যোগ্য।
এভাবে কেটে গেল বেশ কয় মাস। তারপর আমার লেখার দ্বার খুলে গেল। এর মধ্যে একদিন সে বলল, ভাই, ভাবছি আর লেখা হবে না। লেখালেখি বন্ধ করে দেব। বললাম, সে কী, তোমার লেখার ধার তো বাড়ছে তাহলে বন্ধ করবে কেন? সে বিষণ্ন মুখে বলল, না ভাই, আমার লেখার ধার আর তেমন কী, আমার স্ত্রীর মুখের ধার অনেক বেশি। আমাকে বলে, কী সব ছাইপাঁশ লিখো, দুই লাইনের বেশি পড়া যায় না। এসব বাজে কাজে সময় নষ্ট না করে সংসারের কাজে মন দাও। আমি বললাম, তুমি একটা কাজ করো, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে একটি প্রেমের কবিতা লেখো, দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
সে বলল, তাই নাকি! আপনি নিশ্চিত?
বললাম, রবীন্দ্রনাথের অধ্যাপক গল্প পড়েছো?
সে বলল, না।
আমি বললাম, তাহলে শোনো, রবীন্দ্রনাথ তাঁর অধ্যাপক গল্পে লিখেছেন, রাজা শিবসিংহের মহিষী লছিমা দেবীকে কবি বিদ্যাপতি ভালবাসিতেন এবং তাঁকে না দেখিলে তিনি কবিতা রচনা করিতে পারিতেন না। কেবল বিদ্যাপতিকে বলা কেন, এমন প্রচুর কবি, উপন্যাসিক আছেন যাঁরা সুন্দর সুন্দর লিখেন যাদের ভালবাসার মানুষকে কেন্দ্র করেই লিখেন। জীবনে ভালবাসার মানুষ নেই, এমন খুব কম লেখকই আছেন। তাই তুমি হাল ছাড়বে না, চালিয়ে যাও।
সে বলল, ভাই মাঝে মাঝে তুমি আবোলতাবোল বকো। আমি লিখতেই পারি না, তার ওপর কবিতা লিখব! আর যদিও তাকে নিয়ে লিখি, সে বিশ্বাসই করবে না যে কবিতা তাকে নিয়ে লিখেছি। তখন আবার ঝামেলা হবে, বাদ দাও।
আমি হঠাৎ তাকে বললাম, আচ্ছা তুমি এত বিচলিত কেন? ঘন ঘন এদিক-ওদিক কী দেখছো? সে বলল, ভাই, তুমি কি আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ? তুমি কীভাবে জানলে আমি বিচলিত হয়ে এদিক-ওদিক দেখছি? বললাম, না এমন কিছু না, সবই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ব্যাপার। আচ্ছা ভালো থেকো, পরে কথা হবে। পরক্ষণেই সে আবার ফোন করে বলল, ভাই আমি তো কিছুই লিখতে পারছি না, তুমি আমাকে কীভাবে দেখেছ? আমি বললাম, আরে! করো কী! আস্তে! অত জোরে চুল টানবে না। সে প্রথমে অবাক এবং পরে বিরক্ত হয়ে বলল, দূর মিয়া, তুমি খুব ঝামেলা করো। বলেই ফোন রেখে দিল। আমি বুঝলাম তার কৌতূহলের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। তাকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থেকে বের না করলে তার লেখা বন্ধ হয়ে যাবে। এর পর অনেক দিন কথা বন্ধ। মনে হয় সে ঠিক করেছে আমাকে আর ফোন করবে না। আমি একদিন নিজেই ফোন করলাম। সে বলল, কেমন আছো ভাই? বললাম, আমি তো ভালোই ছিলাম; কিন্তু তোমরা কোনো ফোন না পেয়ে কিছুটা চিন্তাগ্রস্থ। সে এবার হেসে বলল, যাক তাহলে তুমিও চিন্তিত হও? বললাম, প্রাণিকূলে একমাত্র মানুষই তো সুদূরপ্রসারী চিন্তা করার ক্ষমতা রাখে। সে বলল, মানুষ সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে পারে আর অন্যান্য প্রাণী কি অল্পবিস্তর চিন্তা করতে পারে?
আমি বললাম, ঠিক তাই। তা নির্ভর করে সেসব প্রাণীর মস্তিষ্কের ক্ষমতার ওপর। যেমন মানুষের পর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার একধরনের বানর, নাম ওরাং-উটান। তবে তার চিন্তা সীমিত। যেমন কোনো