যাত্রীছাউনিতে বসে বাসের অপেক্ষায় আছি। পুরো রাস্তা ফাঁকা। একটাও গাড়ি নেই। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। যেকোনো সময়ই বৃষ্টি নেমে শহর ভাসিয়ে দিতে পারে। হঠাৎ একটা বাস আসতে দেখা গেল। কয়েকজন যাত্রী ছাউনি থেকে ছুটে গিয়ে বাসে উঠল। ভিড় দেখে আমার আর উঠতে ইচ্ছে হল না। পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। আমার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। হঠাৎ অন্ধকারে ঢেকে গেল আকাশ। মেঘ গর্জন করছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তারপর হুড়মুড় করে শুরু হল বৃষ্টি। আমি যেখানে বসে আছি, সেখানে ছাউনি নেই। মাথার ওপর মেঘে ঢাকা এক বিশাল আকাশ। আকাশের বুক ভেঙে যাওয়ার মতো বৃষ্টি ঝরছে আমার মাথার ওপর। আমি ভিজে যাচ্ছি। শার্ট, গেঞ্জি সব ভিজে যাচ্ছে। আর আমার ভালোই লাগছে। অন্যরা আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে। দুই কিশোর আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কে জানে, হয়তো পাগল ভাবছে আমাকে।
আমি রাস্তার ওপাশে তাকিয়ে আছি। একটা মেয়ে আমাদের ছাউনির নিচে দৌড়ে আসছে। সে ভেজা একাকার হয়ে গেছে। তার চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। দ্রুতই রাস্তা পানিতে ভরে যাচ্ছে। সে পানি হাঁটু পর্যন্ত পা দিয়ে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে হেঁটে যাচ্ছে। আমি প্রতিদিনই এখানে এসে বসি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কখনও এই মেয়েটিকে দেখিনি। তার চেহারাটা মনেও পড়ছে না। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়া তার চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। আরে, মেয়েটি আমার দিকেই আসছে। আমার চোখ সরানো উচিত, কিন্তু সরাতে পারছি না।
আমি লজ্জাহীনভাবেই তাকে দেখতে থাকি। মেয়েটি আমার খুব কাছে চলে এল। তার গা থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। এই নেশা কোনো মাদকের চেয়েও ভয়ঙ্কর। আমি চোখ খোলা রাখার চেষ্টা করি, কিন্তু পারছি না। দেহ-মনে একটা ক্লান্তি চেপে বসছে। চোখে ঘুম আসছে। অনেক চেষ্টা করেও তার সৌন্দর্য আর দেখা যাচ্ছে না। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমি কি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি? আমি কি আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না? আমি আর কখনও কি এই মেয়েটিকে দেখতে পাব না? এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখতে পাব না! আমি আর পৃথিবী, দুজনেই অধুর থেকে গেলাম!