কাঠের পুতুল, নাচে না কুহকে
খেলায় মশগুল পুতুল নিজেই পুতুলে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু ওকে কে নিয়ে যাবে বনির আসরে এই নাচ দেখাতে? বোধ হয় ছোট কাকু কিংবা ভাইয়েরা, যেহেতু এই নাচটি মেয়ে-ছেলে উভয়কেই টানে। মাইশার মনে পড়ে পুতুলঘরের জীবন্ত সংসারটি তার কত বড় ছিল! যেমন ছিল নানা ধরনের পুতুল, তেমনি সোনালি, রুপালি হাঁড়ি-কড়া, দা, ছেনা, নারকেল কোরানি, ঢেঁকি, ছোরা, পানের বাট, জাঁতি ইত্যাদি। সেসময় কেউ কি ভেবেছিল এগুলো আলতামিরার গুহাচিত্র।
এই পুতুল কীভাবে নাচে, তা দেখার জন্য সে মুখিয়ে পড়েছিল যখন ‘পুতুল নাচ’ শব্দটি তার কানে বারংবার আসতে থাকে। নাচের চেয়ে জরি-তারের পোশাক বা পুতুলের মিষ্টি কণ্ঠে কথা বলার ধরন তার চোখ-কান কম ধাঁধিয়ে দেয়নি।
অনেকের মতোই, তার জন্যও কিছু ঘটনা সময়ের সাথে সাথে বোঝার অযোগ্য হয়ে যায়। খেয়েপরে পড়াশোনা চালানো অনেক কষ্টের, যদিও অর্থের তেমন কোনো অভাব নেই। ‘এই মেয়ে, নিজের পায়ে দাঁড়াও’—এই কথাগুলো সে কীভাবে মনে রাখবে? অসময়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে কয়টা বাঁকাবাঁকা পথ ধরতে হয়, এসব মাইশার ভালো লাগে না। সে দেখেছে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের মধ্যে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা সবাই মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। এদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা আধেক। বেকার ছেলেমেয়েরা উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে অনলাইনে সব টিকিট অগ্রিমে কেটে নেয়।
তারপর ৫০ টাকা লাভে টিকিট কালোবাজারিদের কাছে বিক্রি করা হয়, কালোবাজারি আবার ৫০ থেকে ১০০ টাকা লাভে যাত্রীদের হাতে ছাড়ে। এইভাবে অনেক হাত ঘুরে যাওয়ার কারণে টিকিটের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। একদিন দুপুরে স্টেশনে নিজের জন্য টিকিট কিনতে গিয়ে হয়রান হয়ে দুপুরের রোদ-ঝড়ে ফিরছিল, তখন সে সিগন্যাল কেবিনের পাশে জামগাছের নিচে দেখতে পেল বহু পাখির ঠোকর খাওয়া জাম, আর রেলপথের পাশে পাটগাছের পাতাগুলো রোদের দাপটে ম্লান হয়ে গেছে। আর মেথর পাড়ার কাছে দেখল প্রচুর ডাবের খোসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তার কাছে মনে হলো, যেন চারপাশ শূন্যতার আস্তরণ বিছিয়ে রেখেছে। সে কোনো মহান ব্যক্তি কিংবা মহাপুরুষের কথা মনে করতে পারল না, তবে আবারও কানে বাজল, ‘এই মেয়ে, নিজের পায়ে দাঁড়াও!’ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কি অর্থ দাঁড়িয়ে থাকা? আমি দাঁড়িয়ে থাকব কেন? আমি তো হাঁটছি। আমি কখনো দাঁড়াব না। তার ভাবনা নতুন জায়গায় পৌঁছে গেল, আর সে সামনের দিকেই হাঁটতে লাগল। রোদের ঝাঁজ সইতে না পেরে সে মাথার ঘোমটা আঙুল দিয়ে আঁট করে বাঁধল। সে ভাবল, এইভাবে কিংবা অন্য কোনোভাবেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে এখনো সে বৃদ্ধদের স্মৃতিগুলো রোমন্থন করে পাখা বোনে, নকশি করা কাঁথা তৈরি করে, সময় পেলে কাপড়ে কারচুপি করে, এগুলো অনেক ভালো। এই বয়সের মেয়েরা কি এখনও এসব করে? এজন্য ছোটরা তাকে মাঝেমধ্যে কটাক্ষ করে দাদী-নানি বলেও। তবে প্রতিবেশী সালমা তার কথাটা মনে ধরেছে। সে বলেছিল, ‘মাইশা আপু, তুমি এত এত জিনিস বানিয়ে ঘর ভরিয়ে রেখেছো, কয়েকদিন পরে তো একটা গুদাম লাগবে। তার চেয়ে এগুলো মেলায় পাঠিয়ে বিক্রি করে দাও। কুড়িখাই, কামালপুর, ভাগলপুর…। কোনো খরচ নেই, যেখানেই পাঠাও, অটো ভাড়া বিশ টাকা। শুধু আমাদের গ্রামের একটা ছেলে দরকার, কয়েকদিন বন্দে রাখালি না করে তোমার পাখা-রুমালের পাহারাদার হোক।’ সালমার কথাটা মাইশার মনে থাকে। সে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা সত্যিই ভাবে, তবে তার কোনো তাড়াহুড়া নেই।
মা-বাবা ভাবে, অন্যদের মতোই। মেয়ের বিয়ে দিতে পারলেই বাঁচে। উদ্যমী ছেলেমেয়েরা যখন পড়াশোনা বা কর্মজীবনের জন্য কোনো একাডেমিক ডিসিপ্লিন নির্বাচন করার কথা ভাবে, গ্রামের থেকেও যখন অনেকে বিদেশে পড়াশোনা করার কথা ভাবে, কিংবা বিদেশে অভিবাসন করার কথা ভাবে, তখন মা-বাবার এই একটাই কথা বা স্বপ্ন, মেয়ের একটি ভালো বিয়ে হওয়া দরকার। এই বিয়ে নিয়ে একদিন কথা উঠলে মাইশা ক্ষেপে যায়। সে তার বড় ভাই বকুলকে বলে, ‘বাবা বলছিল এলাকার অবস্থা ভালো নয়, এলাকার কী হয়েছে?’
‘হয়তো গুন্ডা-মাস্তানের সংখ্যা বাড়ছে।’
‘তাতে আমার কী?’
‘হয়তো ড্রাগের সংখ্যাও কমছে না।’
‘তাতে কার কী বয়ে গেছে?’
‘ওই, বুঝলি না, এক অসিলায় বিদায় করা। তবে তুই তো গ্র্যাজুয়েশন করেছিস, এবার বিয়ের কথা একটু করে হলেও ভাবতে হবে।’
‘এখনই আমি বোঝা কাঁধে চাপাতে চাই না।’
‘কেন? সেই কত আগে থেকেই বিয়ের পরেও মেয়েরা লোখাপড়া চালাচ্ছে। গ্রামে বিবাহিত ছাত্রীর সংখ্যা এখন অনেক