বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ পায়ে চাকরি করছে এক কিশোর
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিল ১৬ বছরের আবুল হাশেম। পুলিশের গুলিতে তার ডান পায়ে আঘাত লাগে। অর্থের অভাবে তার বাবা হাশেমের পা চিকিৎসা করাতে পারেননি। এখন ক্ষতিগ্রস্ত পা নিয়েই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য দোকানে কাজ করছেন হাশেম।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও ইউনিয়নের সিংদই গ্রামের বাসিন্দা হাশেম। তার বাবা আবদুল হেলিম গ্রাম পুলিশ বাহিনীতে দফাদার। হেলিম জানান, তার নিজের অল্প আয় এবং হাশেমের আয়ে তার সংসার চলছিল। কিন্তু গত জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হাশেম গুলিবিদ্ধ হওয়ায় সবকিছু উল্টে গেছে।
হাশেম জানায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পরিবারকে সাহায্য করার জন্য সে চার বছর আগে গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকায় ফুফাতো ভাই হুমায়ুনের মনিহারির দোকানে কাজে যোগ দেয়। গত ২০ জুলাই প্রতিদিনের মতো সে দোকানে ছিল। তখন দোকান থেকে কিছু দূরে প্রধান সড়কে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মিছিল হচ্ছিল। সশস্ত্র পুলিশ মিছিলে ধাওয়া করলে মিছিলকারীরা ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। হাশেমের দোকানের কাছে পুলিশ আসতেই সে ভয়ে দোকানের শাটার নামিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পরে তার ফুফাতো ভাই হুমায়ুন কবির দোকানে প্রবেশ করেন। এ সময় কয়েকজন পুলিশ শাটার উঠিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
হাশেম বলেন, পুলিশের গুলিতে তারা দুজনেই দোকানের ভেতরে লুটিয়ে পড়েন। পুলিশ আবার তাদের নড়াচড়া দেখে রাইফেল তাক করে। কিন্তু সেনাবাহিনীর সদস্যরা আসতেই পুলিশ চলে যায়। এরপর তাদের দুজনকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে হুমায়ুন কবিরের মৃত্যু হয়। আর হাশেম পাঁচ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান। গুলিবিদ্ধ পা নিয়ে তিনি নান্দাইলের বাড়ি ফিরে আসেন।
হাশেমের বাবা বলেন, ধারদেনা করে তিনি ৪০ হাজার টাকা জোগাড় করে হাশেমের পায়ের চিকিৎসা করেছেন। কিন্তু তার পা পুরোপুরি ভালো হয়নি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, ছররা গুলি বের করতে হলে আরও কয়েকটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে। এতগুলো অস্ত্রোপচার করার মতো শরীরিক সামর্থ্য হাশেমের নেই। ফলে হাশেমকে যন্ত্রণা নিয়েই চলতে হচ্ছে।
হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তার দোকানটি কিছুদিন বন্ধ থাকে। এখন হুমায়ুনের বড় ভাই হজরত আলী দোকানটি দেখভাল করছেন। হাশেম সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পা নিয়েই আবার কাজে যোগ দিয়েছেন। তিনি বসে বসে দোকানে কাজ করেন। পায়ে যন্ত্রণা থাকলেও পরিবারের জন্য তাকে আবার চাকরি নিতে হয়েছে।
হাশেমের বাবা অভিযোগ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে হাশেমের জন্য কোনো সহায়তা করা হয়নি। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলে শুনেছি। কিন্তু কেউ আমার ছেলের খোঁজ নেয়নি। তাই পুলিশের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত পা নিয়ে উপার্জনের পথে নামতে হয়েছে আমার ছেলেকে। বসে থাকলে কে খাওয়াবে। কীভাবে আমার পরিবার চলবে?’