ফসলী মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সাদা রঙের একটা বড় ঘর। ওপরের দিকটা দেখতে ঢেউ খেলানো। প্রায় দোতলা উঁচু ঘরটার নাম ‘পলিনেট হাউস’। বিশেষ ধরনের পলিথিন আর লোহার পাইপ-অ্যাঙ্গেল দিয়ে তৈরি এই ঘরের ভেতরে হচ্ছে নানা রকমের শাকসবজি, ফুল, ফল আর শাকসবজির চারা উৎপাদন। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা—সারা বছরই চলে চারা উৎপাদনের মহাযজ্ঞ।
নাটোর জেলার ছাতনী দিয়াড় আর মির্জাপুর দিয়াড় গ্রামে কয়েক বছরের ব্যবধানে এমন চারটি বড় পলিনেট হাউস তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি হলেও ছাতনী গ্রামটা আছে সদর উপজেলায় আর মির্জাপুর গ্রামটা নলডাঙ্গায়। সম্প্রতি সেই এলাকাটা ঘুরে দেখা গেছে, চারা উৎপাদনকারী সবাই বয়সে তরুণ। পলিনেট হাউসে ভালো মানের চারা উৎপাদন করে তারা বেশ সাড়া ফেলেছেন। কৃষকদের আস্থাও অর্জন করেছেন। সামান্য সময়ে নিজেদের বেকারত্ব কাটিয়েছেন তারা। পাশাপাশি অনেক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
ছাতনী দিয়াড় গ্রামের ইউছুব প্রামাণিকের ছেলে রাজীব হোসেন আর্থিক অসুবিধার কারণে এসএসসি পর কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াতেন। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীদের পরামর্শে ২০১১ সালে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ক্যাপসিকাম চাষ শুরু করেন। চার মাসে দেড় লাখ টাকা লাভও হয়। তখন কিছুটা জমি বর্গা নিয়ে তিনি তরমুজ, ফুলকপি, টমেটো আর পেঁপে চাষ করেন। কিন্তু ভালো মানের চারা না পাওয়ায় লোকসানে পড়েন। তখন থেকে তিনি চারা উৎপাদনে মনোনিবেশ করেন।
রাজীব জানান, রাজশাহী কৃষি প্রকল্পের আওতায় ২০২২ সালের শেষে কৃষি বিভাগ তাঁকে একটি পলিনেট হাউস তৈরি করে দেয়। মাত্র দুই লাখ টাকা নিয়ে ২০২৩ সালের শুরুতে তিনি সেখানে চারা উৎপাদন শুরু করেন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার চারা বিক্রি করেছেন। খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ ১১ হাজার টাকা। রাজীব হোসেনের পলিনেট হাউসে নিয়মিত হয় ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, টমেটো আর পেঁপের চারা। এ ছাড়া ঋতু অনুযায়ী করলা, স্কোয়াশ, তরমুজ আর শসার চারাও উৎপাদন করেন তিনি। কিছু জমি কেনার পাশাপাশি তিনি আরও সাত বিঘা জমি বর্গা নিয়েছেন। নতুন করে আরও একটি পলিনেট হাউস তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
২৬ বছর বয়সী রাজীব হোসেন এখনো বিয়ে করেননি। নিজের সফলতা সম্পর্কে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, "এখন আমি আর চাহিদা অনুযায়ী চারা সরবরাহ দিতে পারি না। সারাক্ষণ অনলাইনে চারার অর্ডার আসছে। এই এলাকায় আমিই প্রথম পলিনেট হাউসে চারা উৎপাদন শুরু করি। আমাকে দেখে অন্য তরুণরাও এই পেশায় আসছে। ভাবতে ভালো লাগে।"
রাজীব হোসেন বলেন, তিনি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি দামে বীজ কেনেন। ফলে ভালো মানের চারা হয়। কৃষকরা এই চারা কিনে সফলতা পান। তা ছাড়া কোকোপিট (মাটির বদলে নারকেলের ছোবড়া ব্যবহার) পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করায় চারার শিকড় নষ্ট হয় না। চারা টেকসই হয়। এ কারণে কৃষকদের আস্থা বাড়ে।
ছাতনী গ্রামের বয়স্ক কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, "ছেলেটা (রাজীব হোসেন) আগে ঘুরে বেড়াত। হঠাৎ কৃষি বিভাগে প্রশিক্ষণ নিয়ে পলিথিনের ঘর তৈরি করেছে। ওই ঘরের ভেতরে এখন চারা করছে। চারার ব্যাপক চাহিদা আছে। দূরদূরান্ত থেকে লোক এসে চারা নিয়ে যায়।" রাজীবের সফলতা দেখে গ্রামের অন্য বেকার তরুণরাও নিজেরাই পলিথিনের ছোট ছোট ঘর বানিয়ে চারা উৎপাদন করছে। সাইফুল ইসলাম বলেন, তারাও চারা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে।
বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ইলিয়াছ শেখ এসএসসির পর কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের অর্থনৈতিক অসুবিধার কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। কিন্তু সেখানে মানিয়ে নিতে না পেরে মির্জাপুর গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন। বাবার দেওয়া কিছু পুঁজি নিয়ে তিনি একটি মুদিদোকান খুলেন। পাশাপাশি কৃষিকাজের দিকে মনোনিবেশ করেন।
পাশের গ্রামের রাজীব হোসেনের অনুপ্রেরণায় তিনিও চারা উৎপাদন শুরু করেন। উৎপাদিত চারা নিয়ে উপজেলা কৃষি মেলায় তিনি টানা তিনবার (২০২২-২৪) পুরস্কার জিতেছেন। উৎসাহ বেড়েছে তার। তিনিও সরকারের কাছে পলিনেট হাউস তৈরির আবেদন করেন। সরকারি খরচে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ২৪ শতক জমিতে তাঁর জন্য পলিনেট হাউস তৈরি করা হয়। তখন থেকে তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন শুরু করেন।
ইলিয়াছের এখন দুটি পলিনেট হাউস রয়েছে। তিনি জানান, সাত প্রকৃতির শাকসবজির চারা উৎপাদন দিয়ে শুরু