• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৪:২৬ অপরাহ্ন |

একাত্তরের বন্ধু বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি মারা গেছেন

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিশ্বের কাছে পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নৃশংসতা তুলে ধরা সেই ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ রোববার বিবিসির সাবেক এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মৃত্যু হয়।

দশকের পর দশক ধরে মার্ক টালির গম্ভীর ও মায়াবী কণ্ঠস্বর বিশ্বের বিবিসি শ্রোতাদের কাছে ছিল অত্যন্ত পরিচিত। একজন সংবাদদাতা হিসেবে তিনি যেমন প্রশংসিত ছিলেন, তেমনি বিভিন্ন দেশের রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে করা তাঁর প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণও ছিল সমানভাবে সমাদৃত। মার্ক টালি যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাভার করেন।

১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্ম হয় মার্ক টালির। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। মা জন্মেছিলেন বাংলায়; যাঁর পরিবার বংশপরম্পরায় ভারতে ব্যবসায়ী এবং প্রশাসক হিসেবে কাজ করে আসছিল।

এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, শৈশবে এক ব্রিটিশ আয়ার কাছে বড় হন মার্ক টালি। একবার বাড়ির গাড়িচালককে অনুকরণ করে হিন্দি ভাষায় গণনা শেখায় সেই আয়া তাঁকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওটা চাকরদের ভাষা, তোমার নয়।’

তবে কালক্রমে মার্ক টালি হিন্দি ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন, যা দিল্লির বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে ছিল এক বিরল কৃতিত্ব। এই গুণটি তাঁকে বহু ভারতীয়র কাছে প্রিয় করে তুলেছিল, যাঁদের কাছে তিনি ছিলেন চিরকালই ‘টালি সাহেব’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই নয় বছর বয়সে শিক্ষার উদ্দেশ্যে ব্রিটেনে যান মার্ক টালি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়ার পর যাজক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে থিওলজিক্যাল কলেজে ভর্তি হন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত চার্চ এবং তিনি নিজে—উভয়ই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

১৯৬৫ সালে বিবিসির হয়ে ভারতে আসেন মার্ক টালি। শুরুতে একজন প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে হলেও সময়ের ব্যবধানে তিনি সাংবাদিকতার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তাঁর উপস্থাপনার ভঙ্গি ছিল কিছুটা ভিন্নধর্মী ও স্বতন্ত্র।

মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে ১৯৭১ সালের এপ্রিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন মার্ক টালি। ঢাকা থেকে সড়ক পথে রাজশাহী গিয়েছিলেন তিনি।

সেই প্রথম পাকিস্তান সরকার দুজন সাংবাদিককে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছিল। অপরজন ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাংবাদিক ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ।

সেসময় বিবিসি বাংলাকে মার্ক টালি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত পৌঁছাল এবং তারা মনে করল, পরিস্থিতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, তখনই তারা আমাদের আসার অনুমতি দিয়েছিল। আমার সাথে তখন ছিলেন ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকার যুদ্ধবিষয়ক সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ। আমরা যেহেতু স্বাধীনভাবে ঘুরে বেরিয়ে পরিস্থিতি দেখার সুযোগ পেয়েছি, সেজন্য আমাদের সংবাদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবার পথে সড়কের দু’পাশে দেখেছিলাম, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার মাধ্যমে বিশেষ ভূমিকা রাখায় মার্ক টালিকে ২০১২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ দেয় বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *