এবারের অভিযানে মাউন্ট এভারেস্টের বেজক্যাম্পেই যাওয়া ঠিক করলাম। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছা না হলেও এই দৈত্যাকারের কাছে থেকে দেখা স্বপ্ন হয়ে গেছে। অভিজ্ঞতা হবে নিঃসন্দেহে অসাধারণ।
তিব্বত দিয়ে বেজক্যাম্পের রাস্তাটা অনেক কঠিন ও দুরূহ। কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আকর্ষণ আছে বলে সিদ্ধান্ত নিলাম তিব্বত রাস্তা দিয়েই যাব।
এর জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করলাম। প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার হাঁটা, ওজন কমানো এসব তো আছেই। এ ছাড়াও তিব্বতের অনেক উঁচু জায়গায় যাওয়ার কারণে শরীর ও মন দুটোই শক্তিশালী করতে হবে। তাই শারীরিক ও মানসিকভাবে আরও শক্ত করার জন্য অনেক ব্যবস্থা নিতে হলো।
পরবর্তী সময়ে তিব্বত পাহাড়ের বেজক্যাম্পে যাওয়ার খোঁজখবর নিতে থাকলাম। এমন সময় বিশ্বস্ত বন্ধু সরকার কবীর তার মাউন্ট এভারেস্ট বেজক্যাম্প যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করল। কবীরও অনেক দিন ধরে এভারেস্টের বেজে যেতে চাইছিল। দুজনের পরিকল্পনা মিলে গেল। এরপর শুরু হলো রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রস্তুতি।
অনলাইনে সবকিছু খুঁজে দেখলাম। বুঝতে পারলাম, তিব্বত দিয়ে মাউন্ট এভারেস্ট বেজক্যাম্প যেতে হলে চীনের ভিসা, তিব্বতের পরমিট এবং এভারেস্ট যাওয়ার অনুমতিপত্র লাগবে। আমাদের জন্য তিব্বত ট্যুরিজম বোর্ড অথরাইজড একটি এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া জরুরি।
এরপর কয়েকটি এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলাম। সবকিছু ঠিকথাক মতোই মিলল। তবে অগ্রিম ভাড়া হিসেবে ৪০ শতাংশ টাকা দিতে হবে। অপরিচিত এজেন্সিকে এত টাকা অগ্রিম দেওয়া কঠিন। অবশেষে বন্ধু কবীরের চীনের এক বন্ধুর মাধ্যমে অগ্রিম ভাড়া জমা দিলাম। পাশাপাশি চীনের ভিসাও করে ফেললাম।
এরপর শুরু হলো যাত্রা। চীনে পৌঁছে প্রথম কাজ হচ্ছে তিব্বতের ভ্রমণের পারমিট নেওয়া। আমাদের এজেন্সি তিব্বত থেকে কুরিয়ার করে আমাদের চীনে যে হোটেলে থাকব সেখানেই পারমিট দিয়েছে। দেখি, পারমিট শুধু আট দিনের। তার বেশি সময় তিব্বতে থাকা যাবে না।
পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, আমাদের এজেন্সি ওইভাবেই সব শিডিউল করেছে। পারমিট নিয়ে ফ্লাই করলাম তিব্বতের রাজধানী লাসার পথে।
লাসা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু রাজধানী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই রাজধানী দালাই লামার শহর।
বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে দেখি আমাদের এজেন্সির এক সুন্দর স্মার্ট মেয়ে আমাদের নাম লিখে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে। এক ঘণ্টার জার্নির পর আমরা হোটেলে পৌঁছে গেলাম। এই জার্নিতে গাইড আমাদের অনেক কিছু জানাল। আশপাশে সুউচ্চ পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ। পাহাড়ে কোনো গাছপালা নেই। সব ধূসর রঙের। মাঝে মাঝে বিশাল টানেলের মধ্য দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে।
হোটেলে পৌঁছে দেখি, হোটেলটা দারুণ। কিন্তু ভীষণ ঠান্ডা। রাতে পরিচয়পর্ব আর ডিনার শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। এখানে রাত বলতে সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়াই রেওয়াজ।
ডিনারের সময় আমাদের দলের ১১ সদস্যের সঙ্গে পরিচয় হলাম। আমরা ২ জন বাংলাদেশি, ৩ জন পর্তুগিজ, ১ জন জার্মান, ১ জন আমেরিকান, ১ জন ফ্রান্সিস, ২ জন ভারতীয় এবং ১ জন নেদারল্যান্ডসের। হইহুল্লোর করে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিলাম। লাসার বাতাসে অক্সিজেন কম থাকে। উচ্চতার কারণে শ্বাসকষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলেই গাইড সব রুমে তিন করে পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার রেখে গেছে। তিব্বতের পাহাড়ে গাছপালা না থাকায় এখানকার বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকে।
এর আগেও অনেক উঁচু জায়গায় গিয়েছি। তবে কোনদিনই শ্বাসকষ্ট হয়নি। কিন্তু এখানে তা হয়েছে। রাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করেছি। পরদিন উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সারাদিন লাসায় কাটিয়েছি। শহরে কয়েকটি মনেস্ট্রি দেখলাম। পোতালা প্যালেস দেখলাম। দালাই লামা তাঁর ধার্মিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালনা করেন। দালাই লামা তিব্বতীদের কাছে আধ্যাত্মিক ও ধার্মিক গুরু। পাহাড়ের মতো বিশাল প্রাসাদ। হেঁটে হেঁটে দেখেছি। আর হাঁটা তেমন হয়নি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। শহরজুড়ে অনেক মনেস্ট্রি আছে। লোকজন খুব ধার্মিক। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী।
পরদিন শুরু হলো মাউন্ট এভারেস্ট দেখার কর্মসূচি। সকালে ট্যুরিস্ট বাসে যাত্রা শুরু করলাম। সন্ধ্যার দিকে পৌঁছে গেলাম সিগাতসে নামের শহরে। সিগাতসে দারুণ শহর। ১৩ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত সিগাতসে তিব্বতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। লাসা থেকে ৩৬০ কিলোমিটার দূর। মূ