• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ন |

জীবন বদলানো মায়ের গল্প

সমুদ্রে যাওয়া এক স্বপ্ন পূরণের অনুভূতি

মা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলেন। সামনের দিকটা তাঁর চোখের সামনে পরিষ্কার হতে শুরু করল। সাদা সাদা ফেনার আস্তরণটা ক্রমশই চোখে পড়ছিল। মা চোখ রেখেছিলেন সোজা সামনে দূরে, সাগরের অস্তিত্ব আবিষ্কার করছিলেন। আমি পাশে পাশে হাঁটছিলাম, তাঁর মুখে বিস্ময় আর আনন্দের ছাপগুলো খেয়াল করার জন্য। হঠাৎ করে মা আমার হাত চেপে ধরলেন।

মা বললেন, "আমার পায়ে কী লাগল?" নিচে তাকিয়েই বুঝলাম, এটা সমুদ্রের জল! আমার মায়ের পায়ে স্পর্শ করে গেছে সাগরের জল। মা যেন বিস্ময়ে হতবাক, আর আমার চোখে এসেছে স্বপ্নপূরণের অশ্রু।

আমরা খুবই অবাক হয়েছিলাম যখন জানলাম, মা-বাবা কখনো কোথাও ঘুরতে যাননি। আর কক্সবাজারে সমুদ্র দেখতে আসা, তো একেবারেই আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল।

আমি যখন মা’কে জিজ্ঞেস করতাম, "তুমি কি সমুদ্র দেখেছ?" তখন তিনি উত্তর দিতেন, "হ্যাঁ, টিভিতে তো কত দেখেছি।"

বাবার বয়স এখন ৭০ পার হয়ে গেছে। মায়ের বয়স ৬০ ছুঁই ছুঁই। এত বয়সেও যদি দু’টি মানুষ সমুদ্র না দেখে থাকেন, তা আমার মাথায় ঢুকছিল না। আমরা তো ঘুরতে যাই অনেক জায়গায়, বন্ধুদের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে। অন্তত সমুদ্র দেখার বয়স তো আমাদের প্রায় ২৫-৩০ বছর বয়সের মধ্যেই হয়ে যায়।

অথচ দেখুন, আমাদের মা-বাবা এখনো সমুদ্র দেখেননি! তাঁদের বয়স হয়েছে, শরীরে নানা সমস্যা হয়েছে, প্রতিবন্ধকতাও আছে। এখনো যাওয়া আসা করতে পারলেও, আর ক’দিন পর হয়তো এটাও পারবেন না। তারপর? তাঁরা আর সমুদ্র দেখতে পারবেন না? একজীবনে আমাদের মা-বাবার সমুদ্র দেখা হবে না?

না, এটা হতে পারে না। আমি দ্রুতই অন্য চারজন ভাই-বোনদের সঙ্গে কথা বললাম। পূজার ছুটিতে আমরা সবাই মিলে মা-বাবাকে সমুদ্র দেখিয়ে আনবো।

ভাই-বোনরা প্রথমে খুব উচ্ছ্বসিত হলেও, পরে একের পর এক কাজের কথা আর সমস্যা বেরিয়ে এলো। এছাড়াও মা-বাবার বয়স হয়েছে। মানচিত্রের উত্তরের একটা জেলা থেকে দক্ষিণে যাওয়া। অনেকটা সময় লাগবে, খরচও হবে অনেক। এতটা দূর যেতে যেতে মা-বাবা যদি অসুস্থ হয়ে যান? ছাড়াও বাবাকে ডায়াবেটিস। ঘন ঘন বাথরুমে যাওয়ার সমস্যাটা মাথায় রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপও আছে। সবকিছু বিবেচনা করে কক্সবাজারে যাওয়ার পরিকল্পনাটা প্রায় বাতিলই হয়ে গেল।

কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। আমার মা-বাবা সমুদ্রের জলে পা ভেজাবেন, সেই দৃশ্য আমার নিজের চোখে দেখতেই হবে, যখন সাগরের ঢেউ প্রথমবার আমার মায়ের পায়ের পাতা স্পর্শ করবে আর মায়ের সারা শরীর কেঁপে উঠবে আনন্দে, বিস্ময়ে আর মুগ্ধতায়।

আমি উদ্যোগটা শুরু করলাম। মা-বাবা সমুদ্রে যাবেন বিমানে করে, বাসে বা ট্রেনে নয়। ভাই-বোনদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ হলো। কেউ বিমানের টিকিট কাটবে। আরেকজন দিবে বিমানের ভাড়ার টাকা। বাড়ি থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া ট্রেনে, সেই দায়িত্ব আরেকজনের। আর কক্সবাজারে মা-বাবার পরার মতো উপযুক্ত পোশাক ও অনুষঙ্গের দায়িত্বও নিল আরেকজন। ঠিক হয়ে গেল তো?

বাবা তো চিরকাল চাকরি করেছেন। সন্তানদের পড়ালেখা করানোর জন্য নিজের জন্য তেমন কিছু করেননি। আর মা? দূরের ভ্রমণ তো দূরে থাক, জীবনটাই তো কেটে গেছে বাড়ির আঙিনায়, সন্তানদের লালন-পালন করে, সংসার করে। সমুদ্র বা পাহাড় তো দূরে থাক, বেড়ানো ব্যাপারটার সঙ্গে তাঁদের তো পরিচয়ই নেই। তাই ঘর থেকে বেড়ানোর জন্য তাঁদের রাজি করানোটা খুবই কঠিন একটা কাজ। তারপরও সব সন্তানের মিলেমিশে চেষ্টায় সেটাও হয়ে গেল।

এবার ভ্রমণের পালা। গ্রামের বাড়ি থেকে ছোট ভাই মা-বাবাকে আনলো ঢাকার ট্রেনে। ঢাকার স্টেশন থেকে তাঁদের নিয়ে এক রাত ঢাকায় বিশ্রাম করে, পরদিন সকালে বিমানের যাত্রা। দূরের বাসে যেতেও যাঁদের আপত্তি, তাঁরা জীবনে প্রথমবার পা দিলেন বিমানবন্দরে। সেখানে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করা, লাগেজ চেক, আলো ঝলমলে অপেক্ষাকক্ষ ইত্যাদি দেখে দুজনেই যেন মন্ত্রমুগ্ধ।

বিমানে উঠেও মা-বাবার বিস্ময় কাটল না। সিটবেল্ট বাঁধা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ভীষণ অবাক হচ্ছিলেন। রানওয়ে থেকে যখন প্লেনের চাকা উঠতে শুরু করল, তখন হালকা ঝাঁকুনিতে কিছুটা ভয়, কিছুটা শিহরণ, দুটি মানুষের চোখের ভাষা আর মুখের ভাষা আমি হা-পিত্যেশ করে গিলতে থাকলাম। মেঘের ভেতর দিয়ে বিমানের দুটো ডানা দেখিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, "কেমন লাগছে?"

মা বললেন, "এ তো স্বপ্ন!" নিজের গায়ে চিমটি কাটলেন। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি প্রাণভরে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। বললেন, "এই জীবনে আমার জন্যও এটা লেখা ছিল নাকি রে মা?"

বিমানে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *