মহাজনদের গান ভাটি অঞ্চলে বয়ে চলছে
ভাটি অঞ্চলের গান সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়ে হাজির হলো সংগীত প্ল্যাটফর্ম ‘সং জোন’। উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাওরের গান’। প্রথম মৌসুমে প্রকাশিত হবে শেখ ভানু, দূরবীন শাহ, শাহ আবদুল করিম ও শাহ নূরজালালের লেখা আটটি গান। প্রতি সপ্তাহে একটা করে গান ‘সং জোন’র ফেসবুক এবং ইউটিউব চ্যানেলে মুক্তি পাবে। গানে কণ্ঠ দেবেন ভাটি অঞ্চলের স্থানীয় বাউলেরা। তাদের কেউ সরাসরি শিষ্য, কেউবা পরম্পরায় গানগুলো ধরে রেখেছেন।
ভাটি অঞ্চলের ভাবগানের নিজস্ব একটি ঢং আছে। সৈয়দ শাহনূর, শিতালং ফকির, মাওলানা ইয়াসীন, শেখ ভানু, আরকুম শাহ, দীনহীন, রশিদউদ্দিন, জালালউদ্দিন খাঁ, উকিল মুন্সী, কামালউদ্দিন, মুজিবুর বয়াতি, তৈয়ব বয়াতি, কালা শাহ, দূরবীন শাহ, ক্বারী আমিরউদ্দিন – এই পরম্পরাটা অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। ভাটি অঞ্চলের প্রধান বাউল পদকর্তাদের মধ্যে একজন শাহ আবদুল করিম।
তার বন্দনা গান ‘ও হে সর্বশক্তি’ প্রকাশের মধ্য দিয়েই গত ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে এই উদ্যোগ। নিজেকে স্রষ্টার কাছে সমর্পণ করেই শুরু হয় বাউল গানের আসর। সূচনাপর্বের সংগীতই হলো বন্দনা গান। এই পর্বে বাউল নিজেকে খুবই ক্ষুদ্র ভাবে, আর স্রষ্টার মাহাত্ম্য, প্রশংসা এবং স্তুতি গায়।
বন্দনা গানটি গেয়েছেন হবিগঞ্জের জলসুখা গ্রামের করিমশিষ্যা শ্যামলা। এই বাউল সাধিকার মা-বাবা দুজনেই ছিলেন করিমের ভক্ত-শিষ্য। জন্মের পরেই পিতামাতা দুজনেই মুর্শিদ করিম শাহকে তাদের কন্যার নাম রাখার অনুরোধ করেন। করিম শাহ শিশুটির নাম রাখেন শ্যামলা। শিশুকাল থেকেই বাউল করিমের গানের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন শ্যামলা। জীবনের কোনো দুঃখ, জরা, গ্লানি তাকে মুর্শিদ শাহ আবদুল করিমের গান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
‘হাওরের গান’-এর প্রথম মৌসুমের গানগুলোতে আরও কণ্ঠ দিয়েছেন বাউল আবদুর রহমান, বাউল এমরান, দুখু মিয়া, বাউলিয়ানা ফয়সাল এবং শাহ মুহাম্মাদ শিপন। প্রতি সপ্তাহে একটি করে গানের ধারাবাহিকতায় আজ শুক্রবার মুক্তি পাবে দ্বিতীয় গান, ‘থাকবে না রে হাওয়ার পাখি মাটির পিঞ্জিরায়’। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন বাউল আবদুর রহমান। ভাটি অঞ্চলের গানের মহাজনেরা সবাই তাদের পূর্ববর্তী মহাজনদের সঙ্গে থেকে, তাঁদের সেবা করে গানের ভাবধারাটাকে ঠিক রেখেছেন। দীর্ঘ ৩৬ বছর গুরু শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে কাটিয়েছেন বাউল আবদুর রহমান। ভাব-সংগীতের পেছনে পুরো জীবন পার করেছেন তিনি। বর্তমানে এই পরম্পরার তিনি প্রবীণ কান্ডারি। তাঁর স্বরচিত প্রায় পাঁচ শ গান এই সময়ের বাংলা ভাবগানকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই পাঁচ শ গানের মধ্যে একটি হলো ‘থাকবে না রে হাওয়ার পাখি মাটির পিঞ্জিরায়’। এই আধ্যাত্মিক গানে সাধক মানুষের দেহকে খাঁচা এবং প্রাণপাখিকে উড়ে যাওয়া মহাকালীন সত্যটাকে তুলে ধরেছেন অনেকভাবে।
এই আয়োজনটির সমন্বয়ক এবং গবেষক আকাশ গায়েন। এই আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অতীতে ফিরে গেলেন। শোনালেন ভাটি অঞ্চল ঘুরে গান সংগ্রহের গল্প। তিনি বলছেন, ‘২০১৬ সালে নেত্রকোনা থেকে সফর শুরু করেছিলাম। রশিদউদ্দিন, জালালউদ্দিন খাঁ থেকে উকিল মুন্সী – তাদের বাড়ি থেকে শুরু করে আমি গেলাম বাউল শাহ আবদুল করিমের বাড়ি। দেখলাম, বাউল চর্চাটা ঘরকেন্দ্রিক, সেটা তাঁর বাড়িতে আছে। বাড়িতে বাউলেরা থাকছেন, খাচ্ছেন; যেন জীবনে আরেকটা কোনো কাজ নেই, শুধু ভাবচর্চাই মূল কাজ। আমিও যুক্ত হলাম।’ এই গবেষক জানালেন, মূলত সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্যই তিনি বাউলদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। যেন বাউলতত্ত্ব জানতে আগ্রহীদের জন্য তাঁর লিপিবদ্ধ করা তথ্য কাজে লাগে। ‘হাওরের গান’ আয়োজনের মাধ্যমে তিনি দেখাতে চান, স্থানীয়ভাবে বাউলচর্চা কীভাবে হয়। ‘আমরা সাউন্ডটাকে তুলে আনার চেষ্টা করেছি,’ বলেন আকাশ গায়েন।
‘সং জোন’-এর পরিচালক অনুপ আইচও ‘স্থানীয়’ ব্যাপারটির ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘বাতাসের শব্দ, পানির শব্দ, এদের মাঝে একটি দোতারার শব্দ, ব্যঞ্জোর শব্দ মিলিয়ে আমরা যে অর্গানিক ফিলটা পাচ্ছি, এটা আসলেই একটা মোমেন্টাম তৈরি করে।’
এই আয়োজনের শিল্পীদের বিষয়ে অনুপ আইচ বলেন, ‘এখানকার অনেকেই সেরকম বড় গায়ক নাও হতে পারেন বা সেভাবে পরিচিত না-ও হতে পারেন। তবে তাদের দরদ, বিশ্বাস, গানের সঙ্গে একাত্মতাটা – এইগুলো আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি। বড় শিল্পী দিয়ে আমরা স্টুডিওতে রেকর্ড করতে পারতাম, কিন্তু আমরা যথাযথ জিনিসটা খুঁজতে চেয়েছ