• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২০ অপরাহ্ন |

সফলতায় লেখাপড়ার প্রভাব কতটা

লাইফ-এ সাকসেসের সাথে পড়াশোনার সম্পর্ক

শিক্ষা নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য রয়ছে। একটি হল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের, অন্যটি হল টমাস আলভা এডিসনের।

স্কুল ও গ্রামের পড়ালেখা বিদ্যাসাগরের গুরু মাষ্টারের অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষার্থীর একজন ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, "আমার স্পষ্ট মনে আছে, স্কুলের সব শিক্ষার্থীর চেয়ে তাঁর আমার ওপর অনেক বেশি স্নেহ ছিল।" বিদ্যাসাগরের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্যই তাঁর বাবা ছেলেকে নিয়ে কলকাতার পথে রওনা দেন। সেখানে সেই গুরু মাষ্টারও ছিলেন। রাস্তার মাইলস্টোন দেখে সেদিন সেই ছোট্ট ছেলেটি নিজেই ইংরেজি সংখ্যাগুলো শিখতে পেরেছিলেন। উচ্ছ্বসিত গুরু মাষ্টার এরপর বিদ্যাসাগরের বাবাকে বলেছিলেন, "এই ছেলের লেখাপড়ার বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। যদি বেঁচে থাকে, তাহলে একজন মানুষ হয়ে উঠবে।"

বিপরীতে, এডিসনকে তাঁর স্কুলের শিক্ষক "জড়বুদ্ধির" বলেছিলেন। বারবার প্রশ্ন করার কারণে শিক্ষকেরা তার ওপর বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠিতে লেখা ছিল, "আপনার সন্তান সম্পূর্ণ জড়বুদ্ধি। আমরা আর তাকে স্কুলে দেখতে চাই না।" এডিসন তখনও পড়তে শেখেননি। সুতরাং চিঠির কথাগুলো তাঁর জানা ছিল না। তাঁর মা চিঠিটা তাঁকে এভাবে পড়ে শুনিয়েছিলেন: "আপনার ছেলে অত্যন্ত মেধাশক্তিসম্পন্ন। এই স্কুলে তাঁকে শেখানোর মত শিক্ষক নেই। দয়া করে ছেলেটিকে আপনি নিজেই শেখাবেন।" এরপর এডিসন তাঁর মায়ের উদ্যোগে নিজেই লেখাপড়া শুরু করলেন।

উপরের দুটি উদাহরণ এই প্রশ্ন তুলছে যে, কোনটির ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিষ্ঠানের নাকি ব্যক্তির নিজের? ব্যক্তির বিকাশ ও সফলতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কতটা আর নিজের ভূমিকা কতটা? এ বিষয়ে তর্ক হতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বাস্তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহকে নষ্ট করে দেয়। বহু ক্ষেত্রেই এটি ব্যক্তির বিকাশে বাধা দেয় এবং সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেয়। কারণ প্রতিষ্ঠানিক পড়াশোনা একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করতে বাধ্য। অন্যদিকে, ব্যক্তির নিজের আগ্রহ অনুসরণ করে পড়াশোনা সফলতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

সত্ত্বেও, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর পেছনে রাষ্ট্রের একটা ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া, আধুনিক যুগের শুরু থেকেই শহুরে অফিস ও কর্মকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। একই সাথে, মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠাননির্ভর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ দেখেছে যে লেখাপড়ার মাধ্যমে ভাল চাকরি ও আয়ের সুযোগ পাওয়া যায়। ফলে, দরিদ্র পরিবারগুলোও কষ্ট করে তাদের সন্তানদের পড়ালেখা করানোর চেষ্টা করে। তিন-চার যুগ আগেও লোকেদের মুখে মুখে বলা হত, "যারা পড়ালেখা করে তারাই গাড়ি, ঘোড়ায় চড়ে।"

তবে এখন দেখা যাচ্ছে লেখাপড়া করলেই কেউ ভালো অবস্থানে যেতে পারে না। বরং চাকরির বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। শহুরে "উচ্চ" জীবনযাপনের প্রতি অত্যধিক আগ্রহের কারণে এটি ঘটেছে। আসলে সমাজের নিজস্বভাবে কর্মের উৎপাদনের একটি পদ্ধতি থাকা দরকার। এবং রাষ্ট্রকে সেখানে সাহায্য করতে হবে। যেমন, নগরে যত মানুষ বাড়বে, ততই গাড়ির সংখ্যা বাড়বে। তখন বেশি সংখ্যক ড্রাইভার তৈরি করার জন্য রাষ্ট্রকে গাড়ি কেনার জন্য ঋণ সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু সমাজের চাহিদার প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে বেকারত্ব বেড়েছে। লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

লেখাপড়ার গুরুত্ব:

প্রথমত, লেখাপড়া চাকরি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। এই কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বা পদ্ধতিগত শিক্ষাকে এত বেশি গ্রহণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিকাশেও লেখাপড়ার ভূমিকা আছে। এটি ব্যক্তিকে তার নিজের দক্ষতা, কর্ম পদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করে। এ ছাড়া, লেখাপড়ার মাধ্যমে সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা বাড়ে, সূক্ষ্ম এবং গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হয়। লেখাপড়ার কিছু পরোক্ষ ভূমিকাও রয়েছে। যেমন, লেখাপড়া মানুষকে সভ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলে। একই সাথে, এর মাধ্যমে সমাজ এবং রাষ্ট্র এগিয়ে যায়।

রেজাল্ট চূড়ান্ত কথা নয়:

ব্যক্তি কতটা লেখাপড়া শিখেছে, তার মাপকাঠি হিসাবে সনদ এবং শংসাপত্রকে গণ্য করা হয়। চাকরির আবেদন বা ভাল চাকরি পাওয়ার জন্য সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা যাচাই করার ভালো কোন পদ্ধতি না থাকায় পড়াশোনা সনদনির্ভর হয়ে গেছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া এবং নকল করার প্রধান কারণও এটি। যদিও পরীক্ষায় পাস করা বা চাকরি পাওয়ার সাথে জীবনের সফলতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *