গ্যাস-তেল অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দিতে হবে
বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান পূর্ববর্তী সরকারের রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি ট্যাক্স নামে শত শত কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ করার তীব্র নিন্দা করেন। একই সাথে তিনি ঘোষণা করেন যে ভবিষ্যতে সরকার রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ দিবে না।
জ্বালানি উপদেষ্টার এমন ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানাই। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে বিদ্যুৎ সংকট মেটাবার জন্য সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বেসরকারি খাতে রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়। তবে এটি চিরদিন চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমরা বারংবার ক্যাপাসিটি চার্জ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছি। ক্যাপাসিটি চার্জ এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় বা না হোক কি না কেন্দ্রের মালিককে প্রচুর অর্থ দিতে হয়।
তৎকালীন সরকার উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়নি। তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা দিতে এসব অনুমতি দেয়। এজন্য তারা একটি সর্বজনীন ক্ষমা আইনও পাস করেন।
পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে যে দুর্নীতি হয়েছে তার পেছনেও রয়েছে ২০১০ সালের সর্বজনীন ক্ষমা আইন। সরকার এমন কোন আইন করতে পারে না যা বৈষম্যমূলক এবং কাউকে বেশি সুবিধা দেয় কাউকে বঞ্চিত করে।
উল্লেখ্য, ফাওজুল কবির খান জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পরে বলেছেন, "আমরা এই আইন আর চালু রাখবো না। এই আইনের অধীনে যেসব চুক্তি হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটি করেছি। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। আর নতুন করে কোনো কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের চুক্তি বাড়ানো হবে না, হচ্ছে না। এ বিষয়ে যথাযথ চিন্তাভাবনা করে পিডিবিকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছি, তারা ১৬ বছর লাভ করেছে আর নয়। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারণে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে।"
আমরা জ্বালানি উপদেষ্টার এই বক্তব্যকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি। অন্যান্য খাতের মতো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও জ্বালানি খাতে লুটপাট এবং দুর্নীতি হয়েছে যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। জনগণকে বিদ্যুৎ সেবা দেওয়াটাই যদি আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্দেশ্য হয় তবে তারা কেন দায়মুক্তির একটি আইন করবে? রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শত শত কোটি টাকা অপচয় করার এখতিয়ার কারো নেই। আমরা বিশ্বাস করি যে এই খাতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরী।
আওয়ামী লীগ সরকার চেষ্টা না করেই মাটি এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা গ্যাস-তেল তোলার একটি আমদানি নির্ভর জ্বালানি খাত তৈরি করে ফেলেছে। এতে কিছু ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীবিশেষ লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। জ্বালানী উপদেষ্টা জানিয়েছেন যে সরকার দ্রুত নতুন গ্যাস এবং তেলক্ষেত্র অনুসন্ধানের জন্য উদ্যোগ নেবে। কাজটি যত দ্রুত শুরু হবে ততই মঙ্গল বলে মনে করি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরেই মাটির নিচে এবং সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের জন্য কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বলছেন। কিন্তু তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকরা এটি আমলে নেননি; বরং তারা জ্বালানি আমদানির নামে একশ্রেণীর মানুষকে কমিশনের দালালির সুযোগ করে দেন। আর পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বিদেশ থেকে সস্তায় তেল কিনে দেশের মানুষকে বেশি দামে বিক্রি করেন।
নির্বাহী আদেশে নয়, যদি গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে হয় তবে তা করতে হবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এর মাধ্যমে। গণশুনানি করলে সিস্টেম লসের নামে এই খাতে যে ভয়াবহ দুর্নীতি এবং অপচয় হচ্ছে, সে সম্পর্কে জনগণ জানতে পারবে।