• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২০ অপরাহ্ন |

ছেলের দৌড়ে মায়েদের চোখে জল

ছেলেটার দৌড়টি দেখলে আজও চোখ ভিজে যায়

একেকটা ভালো স্কুলে বাচ্চাদের ভর্তি করা কতটা কঠিন, সেটা তো আমরা জানিই। ঢাকার এমনই একটা নামকরা স্কুলে যখন আমার ছেলে আসওয়াদের লটারিতে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হলো, তখন বাড়িতে যেন ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল।

ক্লাস শুরু হওয়ার পর আমি প্রথম দিন আসওয়াদকে স্কুলে নিয়ে গেলাম আর দেখি তার জন্য নবীনবরণের আয়োজন চলছে। আমার ছোট্ট ছেলেটি মাঠের মধ্যে ফুল হাতে কী দৌড়টাই না দিল। সেদিনের ভিডিওটি দেখলে আজও আমার চোখ ভিজে যায়।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রতিদিন আমি তাকে বাসা থেকে নিয়ে যাই, আবার আনি। এভাবে প্রায় এক বছর ভালোই চলল। হঠাৎ একদিন আসওয়াদ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাকে এ ডাক্তার, ও ডাক্তার দেখানোর ফলে অনেক দিন কেটে গেল। শেষ পর্যন্ত জানতে পারলাম তার "ট্যুরেট সিনড্রোম" হয়েছে। এটা স্নায়ুর বিকাশের সাথে সম্পর্কিত (নিউরোডেভেলপমেন্টাল) একটি রোগ।

আসওয়াদের বডি পার্টগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি, নড়াচড়া আর মুখে নানা রকম শব্দ করা তাকে মাঝে মাঝে অনেক কষ্ট আর অস্বস্তিতে ফেলে। জীবনের সব আনন্দ উপভোগ করার বয়সে আমাকে ওকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে, কাউন্সেলিং-এ নিয়ে যেতে হয়। মাঝে মাঝে কষ্টে সে কাঁদে। আমরাও কাঁদি। চিকিৎসা চলার সময় জানা যায়, মস্তিষ্কের বিকাশের সাথে সম্পর্কিত সমস্যার পাশাপাশি আসওয়াদের এডিএইচডি (মনোযোগের ঘাটতি) ও ডিসলেক্সিয়া (লেখাপড়ায় অসুবিধা) আছে। এসব জেনে আমরা খুবই ভেঙে পড়েছিলাম।

তবে মায়েদের ভেঙে পড়ার উপায় নেই। আসওয়াদের চিকিৎসা চলতেই থাকে। তার চিকিৎসা চলার সময়ই পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো কোভিড-১৯। ফলে দুই বছর হারিয়ে ফেলি। নতুন বাস্তবতায় পৃথিবী আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। আমরাও আসওয়াদকে আবার বাসার পাশেই একটা সরকারি স্কুলে ভর্তি করলাম। যেন আবার প্রথম থেকে শুরু হলো সব।

আসওয়াদ অসম্ভব মিশুক আর বুদ্ধিদীপ্ত একটা ছেলে। কোনোভাবেই আমি তার পেছনে পড়তে দিতে পারি না। সেই জন্য তার চিকিৎসার পাশাপাশি তার মনোবল বাড়ানোর জন্য আর শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমি তাকে ফুটবল আর কারাতে শিখতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। মনোযোগ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত সাঁতার কাটতে নিয়ে যাই। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

মুখে সবকিছু পারলেও ডান হাতের দুর্বলতার কারণে স্বাভাবিকভাবে আসওয়াদ দ্রুত লিখতে পারে না। বড় ক্লাসে ওঠার সাথে সাথে সে সবার সাথে তাল মিলিয়ে লিখতে পারছে না। ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। ক্লাসেও লজ্জার সম্মুখীন হতে হয় তার। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ডিসলেক্সিয়া বা এডিএইচডি বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোনো শিক্ষাক্রম, আলাদা স্কুল বা পরীক্ষার জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। উন্নত দেশগুলোতে এধরনের বাচ্চাদের জন্য আলাদা স্কুল নয়, তাদের জন্য আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা আছে। বেসিক ট্রেনিং, ছোট সিলেবাস, অডিও ভিজ্যুয়াল পরীক্ষা বা মৌখিক ব্যবস্থা, অতিরিক্ত সময়সহ আরো অনেক কিছু। সুস্থ স্বাভাবিক, অসুস্থ সবাই একসাথে ক্লাস করে। একজন অভিভাবক হিসেবে আমার প্রশ্ন, সম্ভাবনাময় আসওয়াদদের জন্য এমন একটা আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা আমরা কি পেতে পারি না? এসব চিন্তাভাবনা নিয়েই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটা কোর্সে ভর্তি হয়েছি। সেখানে অক্ষম এবং অটিজম আক্রান্ত শিশুদের সমন্বিত শিক্ষা নিয়ে পড়ানো হবে।

আমি একটা ‘চারা’ লাগাতে চাই। সেই গাছের ফল আসওয়াদ হয়তো খেতে পারবে না, তবে অন্য প্রজন্ম তা খেতে পারবে। সেই সুদিনের অপেক্ষায় আমি দিন গুনছি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *