চা–বাগান যখন আমার ‘শ্রেণিকক্ষ’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের একদল ছাত্র-ছাত্রী মাঠ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চা–শ্রমিকদের সাথে সময় কাটিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন, ইমরান হাসান তার অভিজ্ঞতা লিখেছেন।
চতুর্থ বর্ষের ব্যবহারিক নৃবিজ্ঞান কোর্সের অংশ হিসেবে আমরা শ্রীমঙ্গলের মাধবপুর ন্যাশনাল টি এস্টেটে তিন দিনের একটি সংক্ষিপ্ত মাঠ কার্যক্রমে গিয়েছিলাম। ১৭-১৯ অক্টোবর আমরা সেখানে ছিলাম। আমাদের সাথে ছিলেন বিভাগের চারজন শিক্ষক—অধ্যাপক আইনুন নাহার ও মাহমুদুল সুমন এবং সহকারী অধ্যাপক মোসাব্বের হোসেন ও আকলিমা আক্তার। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ মাঠ কার্যক্রম, আবার অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীই এর আগে কখনো চা–বাগানে যায়নি। তাই সবার মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল।
কাজের সুবিধার জন্য আমাদের সাত সাতজনের ছোট ছোট দলে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি দল চা-বাগান এবং চা–শ্রমিকদের আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে কাজ করেছে।
মাধবপুর ন্যাশনাল টি এস্টেট বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন চা–বাগান, যা ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত। এর আয়তন প্রায় ১২৫০ একর। এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক এখানে কাজ করেন। ১২টি জাতীয়কৃত চা-বাগানের মধ্যে একটি হলো মাধবপুর ন্যাশনাল টি এস্টেট।
নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে চা–বাগানের ইতিহাস আমাদের অজানা নয়। পার্থক্য হলো, এতদিন আমরা বইয়ের পাতায়-পর্দায় এই ইতিহাস পড়েছি আর এবার স্বচক্ষে, সশরীরে দেখার সুযোগ হলো।
চা–বাগান দেখতে যতটা সুন্দর, চা–শ্রমিকদের জীবন ততটাই করুণ, অসহনীয় এবং অমানবিক। দিনভর ২৩ কেজি পাতা তুলে ১৭৮ টাকা বেতন—এই অন্যায় মজুরি পৃথিবীর আর কোথাও দেওয়া হয় বলে আমার জানা নেই। সেটাও যদি ছয় সপ্তাহের জন্য বন্ধ থাকে, শ্রমিকদের বেঁচে থাকার উপায় কী হবে? প্রশ্নের উত্তর ভেবে পাইনি। চা–বাগানে ঢুকলেই দেখা যায়, প্রচুর মানুষের মল। এগুলো আসলে শ্রমিকদেরই ত্যাগ করা মল। কারণ, পুরো চা–বাগানে শ্রমিকদের জন্য কোনো শৌচাগার নেই। শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে চা–বাগানের কয়েক মাইল পথ পেরিয়ে কলোনিতে যেতে হয়। এর চেয়ে বাগানের কোনো আড়ালে মলত্যাগ করে ফেলাই সহজ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চা–পাতার ভর্তা নিয়ে ইদানীং বেশ ‘রোমান্টিকতা’ হয়। নিজের চোখে যখন দেখলাম, ঠিকমতো খেতে না পারা অস্থিসার মানুষ কোনো খাবারের সংস্থান করতে না পেরে বাধ্য হয়ে চায়ের পাতার ভর্তা করে ভাত বা রুটি দিয়ে খায়, তখন শহুরে মানুষের এই চা–পাতা ভর্তা নিয়ে আদিখ্যেতাকে মনে হয় নিষ্ঠুর মশকরা। এই সুযোগে জানিয়ে রাখি, মাধবপুর চা–বাগানের বেশির ভাগ শ্রমিকেরই মাতৃভাষা ভোজপুরী।
নানা অন্যায়, অবিচারের কথা জানার পরও শ্রমিকদের প্রতি সমবেদনা জানানো ছাড়া আমাদের কিছু করার ছিল না। মাঠ কার্যক্রম চলাকালে আমাদের অনেকে শ্রমিকদের সাথে ছবি তুলেছেন, কেউ কেউ কথা বলতে বলতে চা–পাতা তোলায় সাহায্য করেছেন, কেউ আবার শ্রমিকদের সাথে চা–পাতার ভর্তা খেয়েও দেখেছেন। এ সবই অভিজ্ঞতা হিসেবে আমাদের জন্য নতুন ছিল।
ব্যবহারিক নৃবিজ্ঞানে নৃবিজ্ঞানীদের কাজ হলো কোনো সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেটার সমাধানের জন্য নীতি নির্ধারণী উপায় খোঁজা। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই এই সংকটের সমাধান কী হতে পারে—সেই চিন্তা আমাদের মাথায় ঘুরছিল। আমার নিজের বোধগম্যতা থেকে মনে হয়, এই সমস্যার সমাধান করা কঠিন নয়। প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র ও চা–বাগানের মালিক কর্তৃপক্ষ চায় কি না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিস্তৃত গবেষণা। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে, চা–শ্রমিকদের সংকটের স্বরূপ বুঝতে এবং যথাযথ সমাধান পথ খুঁজতে গবেষণা খুব দরকার।
এসব ভাবতে ভাবতেই মাঠ কার্যক্রমের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে আসে। এক অদ্ভুত বিষাদ আমাকে আর আমার সহপাঠীদের অনেককেই আক্রান্ত করে। ফেরার পথে আমাদের চোখে ভাসতে থাকে কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখ, হাড় জিরজিরে শরীর, হাত দিয়ে ডলে ভর্তা করতে থাকা চা–পাতা।