• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৯ অপরাহ্ন |

ভর্তি পরীক্ষার সেই সময় বাড়ি গেলে লুকিয়ে চলতাম

কৃষি কুঁড়ির খোঁজে লুকিয়ে চলা

গত ২৯ ই অক্টোবর প্রকাশিত হয় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের কৃষি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র জাইমুন ইসলাম প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি ১০০-এর মধ্যে পেয়েছেন ৯৬.৫০ নম্বর। তানভীর রহমান তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

২০ জুলাই হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২৫ অক্টোবরে। তারপরে ফল পেতে সময় লাগে আরও। এত অপেক্ষার পর সফল হওয়ার অনুভূতি কেমন?

জাইমুন বলেন, ভালো প্রস্তুতি ছিল। ভালো করব, এটা জানতাম। পরীক্ষা দেওয়ার পর বুঝতে পারি, ফলটাও ভালো হবে। এত ভালো হবে, সেটা বুঝতে পারিনি। প্রথম হওয়ার যে আনন্দ তা আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ভালো লাগছে পরিবারের সদস্যদের খুশি দেখে।

প্রথম হওয়াটা নিশ্চয় সহজ ছিল না। কীভাবে সম্ভব হলো?

জাইমুন বলেন, প্রথম হওয়ার ক্ষেত্রে একক কৃতিত্ব দিতে হবে আমার দাদাকে। তিনি ময়মনসিংহের ফুলপুরের একজন ব্যবসায়ী। ২০১৮ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর আমার আর আমার পরিবারের খাওয়া-দাওয়ার সব দায়িত্বই তিনিই সামলাচ্ছেন। স্কুল ও কলেজে ভালো ছাত্র ছিলাম আমি। সবার আশাও ছিল বেশি। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে কাঙ্ক্ষিত সোনালি প্লাস পাইনি। সবার মুখভাব দেখে কিছুটা হতাশও হয়েছিলাম। তার প্রভাব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়ও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাইনি, রাজশাহীতেও পেয়েছিলাম একটু পেছনে। জিএসটি গুচ্ছে মেধা ক্রম এসেছিল ২৭০০। দাদা তখনও বিশেষ কিছু বলেননি। কিন্তু আমি অপরাধবোধে ভুগছিলাম। তিনি আমাদের জন্য এত কিছু করছেন, আমি একটা ভালো ফল দেখাতে পারছি না। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। সেটাই ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা। ভালো কিছু করতেই হবে।

কোন নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল?

জাইমুন বলেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারই লক্ষ্য ছিল প্রথমে। কিন্তু ইংরেজিতে এ মাইনাস পেয়ে সেই পথে এগোইনি। মনে হচ্ছিল পরীক্ষা দিতে পারবও না। পরে প্রকৌশল গুচ্ছে পরীক্ষা দিলেও ভালো কিছু হয়নি।

কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?

জাইমুন বলেন, কৃষি ছাড়া অন্য গুচ্ছের পরীক্ষার আগের দিকে নিয়মিত পড়াশোনা হয়নি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় পড়াশোনা বন্ধ ছিল। তার পর কাজ শুরু করি। প্রতিদিন পড়া হতো, তবে নিয়ম করে নয়। একটা ক্যালেন্ডার বানিয়ে রেখেছিলাম। সেখানে তারিখের পাশে লিখে রেখেছি পরীক্ষা কত দিন বাকি। ক্যালেন্ডার দেখে ৩৪ দিন আগে থেকে কঠোর পরিশ্রম শুরু করি। এটাই আমার মূল প্রস্তুতি। মেসে থাকতাম। সেই সময়টা এমন ছিল, মেসে বিরিয়ানি রান্না হলেও খেতাম না। কারণ, তাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে একটা দিনও নষ্ট হয়ে যেত।

প্রস্তুতির সময় কোন বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেটা সারাজীবন মনে থাকবে?

জাইমুন বলেন, কয়েকটা ভর্তি পরীক্ষায় খারাপ করেছিলাম, তখন এলাকার সবাই বলতে শুরু করল, ছেলে পড়ালেখাই করে না, কী কাণ্ড করে বেড়ায়! আমার আম্মু ফোন করে বলত, বাবা, ওরা বলছে তুমি নাকি পড়ালেখা করই না। অথচ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত গণিত আর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় সুযোগ পেয়েছিলাম। হ্যাঁ, এই ফলাফল আমার প্রত্যাশার চেয়ে কমই ছিল। তখন অনেক চাপ ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর প্রতি মাসে বাজার করার জন্য বাড়িতে যেতে হতো। ভর্তি পরীক্ষার সেই সময়ে বাড়ি গেলে কারুর সামনে পড়তাম না। সব সময় লুকিয়ে চলা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বা শাবিপ্রবিতে ভর্তি হলেন না কেন?

জাইমুন বলেন, ফলিত গণিত আর পদার্থবিদ্যা কোনটাই মনের মতো ছিল না। তাই কৃষি গুচ্ছে পরীক্ষা দেই। এখন সুযোগ পেয়েছি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েই কৃষি নিয়ে পড়ব। ইচ্ছে আছে কৃষি গবেষণায় অবদান রাখার।

আপনার বার্তা কী তাদের প্রতি যারা আগামীতে ভর্তি পরীক্ষা দেবে?

জাইমুন বলেন, ভালো করার কোনো শর্টকাট উপায় নেই। পরিশ্রম করতেই হবে। মনের মধ্যে ইচ্ছেটা থাকতে হবে। যারা হতাশ হয়ে পড়েন তাদের বলব, হতাশা কখনো ভালো কিছু নিয়ে আসে না, কখনো না। হতাশা থেকে দূরে থাকতে হবে। আমারও মাঝেমধ্যে পড়তে বসতে ভালো লাগত না। এটা অভ্যাসের ব্যাপার। কিছু দিন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে পড়ার টেবিলে বসা গেলে, পড়াশোনাও অভ্যাসের মধ্যে চলে আসে। তারপর থেকে ভালো লাগবে। সুতরাং যারা ভালো করতে চায়, তাদের প্রথমে কিছু দিন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। তাহলেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *