কার্যে সমন্বয়হীনতা কাম্য নয়
ছাত্র-জনগণের আন্দোলনের ফলে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কারণ স্বৈরাচারী সরকারের আমলে মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। এটা একদিকের কথা। অন্যদিকে, অনেকেই বলছেন যে আগের সরকারের আমলে বঞ্চিতদের কথা বলতেই তারা এসেছেন। সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে যে আসলে কারা বঞ্চিত হয়েছিলেন আর কারা ক্ষমতার হাতবদলের সুযোগটি আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে কাজে লাগাতে চাইছেন।
যেকোনো দায়িত্বশীল সরকারেরই উচিত জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, রাজনৈতিক শান্তি রক্ষা এবং মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করা। এই কাজগুলো অন্তর্বর্তী সরকার কতটা ভালোভাবে করতে পেরেছে, সেই প্রশ্নও উঠছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। পুলিশের পাশাপাশি যৌথ বাহিনীকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োগ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সেনা শিবির বসানোর পরও জনজীবনে নিরাপত্তা ফিরে আসেনি। ঢাকাতেই ছিনতাইকারী এবং ডাকাতরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আবার কোনো কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলেও আইনশৃঙ্খলা অবনতি ঘটছে। অশান্ত পাহাড়ে এখনো মাঝে মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
জাতীয় পার্টির কর্মসূচিকে ঘিরে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় পার্টি নিয়ে কারো অভিযোগ থাকলে সেক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার নামে কিছু লোক জাতীয় পার্টির অফিসে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করেছে। শুধু তাই নয়, পরের দিন খুলনায়ও জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা করা হয়েছে। এভাবে অন্য সংগঠনের কর্মসূচি বন্ধ করা বা তাদের অফিসে হামলা করা কাম্য নয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যারা জুলাই-আগস্ট মাসের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারাও বলেছেন যে, সেখানে তাদের কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। কোনো গোষ্ঠী কি পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার জন্যে অতি উৎসাহী হচ্ছে, সরকারের সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। আইন কারোর হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।
মানুষ সরকারের ওপরে তখনই বিশ্বাস করবে যখন তারা দেখবে যে তাদের দৈনন্দিন সমস্যা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে কার্যকর এবং স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের পরিবারকে সহায়তা করা এবং যারা আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। গত শনিবার জুলাই-আগস্ট স্মৃতি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৩০০ পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগটি ভালো। গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের তালিকাটি দ্রুত সম্পূর্ণ করা জরুরি।
সরকারের কাজকর্মে শুরু থেকেই এক ধরনের সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে আবার তা পরিবর্তন করা বা সংশোধন করার কাজে সরকারের অস্থিরতাই প্রকাশ পেয়েছে। সাতটি কলেজের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই বিষয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিন্নমত পোষণ করেছে। তাহলে এই সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে?
বর্তমান সরকার জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল। এই অভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব ছিল এবং রাজনৈতিক দল এবং সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনে এটি সফল হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সব পক্ষের মধ্যে কতটা সমন্বয় রয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব বিষয়ে অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা জরুরি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যারা জুলাই-আগস্ট মাসের গণ-অভ্যুত্থানে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন দুজন এখন সরকারে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ভিন্ন কোনো দাবি নিয়ে মাঠে থাকা বা নামা অপ্রত্যাশিত। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিষয়গুলো মেটানো যেতে পারে। তা না হলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পক্ষগুলো পারস্পরিক সমঝোতা এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে, এটাই প্রত্যাশিত।