প্রথম আলো যখন ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, তখন প্রতিটি কর্মীর মন বুকে আর ঠোঁটে ছিল একটা স্লোগান: ‘যা কিছু ভালো, তা-ই প্রথম আলোর সঙ্গে।’
দেশের মানুষ খুব দ্রুতই এই বার্তাকে তাদের বুকে টেনে নেয়। স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রথম আলোর অফিসে এসে তাদের বিতর্ক বা বিজ্ঞান উৎসবের অনুষ্ঠান ঘিরে প্রথম আলোর সহযোগিতা চায় এবং ওই স্লোগানটি মনে করিয়ে দেয়, ‘আমরাই তো ভালোটা করছি, তাই আপনাদের এখানেই থাকতে হবে। আপনারাই তো বলেন যা কিছু ভালো, তা-ই প্রথম আলোর সঙ্গে।’ দেশে যখন বন্যা হয়, সাধারণ মানুষ প্রথম আলোর অফিসে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসে, ‘আপনারা এগুলো বিতরণ করার দায়িত্ব নিন।’ মানুষের এই আস্থা থেকেই প্রথম আলো ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম আলো বন্ধুসভার মাধ্যমে বন্যা, শীতকাল, সিডর-আইলা প্রভৃতি দুর্যোগকালে ত্রাণ কার্যক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
প্রথম আলোর যাত্রার প্রারম্ভিক দিনগুলোতেই, সঠিকভাবে ১৯৯৮ সালে, একটি বিজ্ঞাপনের অঙ্গীকার হিসেবে পত্রিকাটি নিজের জন্য দলনিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি নেয়। রমনা রেস্তোরাঁর এক কর্মচারী একসঙ্গে দু’টো পত্রিকা পড়তেন। একটিতে ছাপা হতো সরকারের কথা, অন্যটিতে বিরোধী দলের কথা। প্রথম আলো ঘোষণা করে যে সে কোনো দলের মুখপত্র হবে না, হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।
শুরুর দিনগুলোতে প্রথম আলো নিজেকে ‘একুশ শতকের দৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিত। উজ্জ্বল মুদ্রণ, রঙিন পেজ, প্রতিদিন একটা ফিচার পেজ, দলনিরপেক্ষতা, চিন্তা-ভাবনায় আধুনিকতা – এমন বৈশিষ্ট্যে পাঠকরা একটি সত্যিকারের একুশ শতকের দৈনিক হিসেবে প্রথম আলোকে গ্রহণ করে ফেলে।
প্রকাশের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম আলো বাংলাদেশের পাঠকদের প্রিয়তম পত্রিকায় পরিণত হয়। তখন প্রথম আলোর ট্যাগলাইন ছিল: ‘সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক’।
প্রথম আলোর আরেকটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ‘চোখ খুললেই প্রথম আলো, চোখ খুলে দেয় প্রথম আলো’।
২০০৮ সালে প্রথম আলোর এক দশক পূর্ণ হয়। ওই বছর প্রথম আলো খুবই ঘটা করে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করে। স্লোগান হিসেবে বেছে নেয় ‘বদলে যাও, বদলে দাও।’ নিজেকে বদলানোর কথাটিই বিশেষভাবে বলা হয়। প্রত্যেকেই যদি একটু করে ইতিবাচকভাবে বদলে যাই, তাহলে দেশ এবং জগৎ অনেকটাই সামনে এগিয়ে যাবে। সে বছর প্রথম আলোর কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক মানুষ বদলের শপথ নেয়।
‘বদলে যাও, বদলে দাও’, এই স্লোগান পরবর্তী বছরগুলোতেও অব্যাহতভাবে প্রচার করে যায় প্রথম আলো। ২০০৯ সালের ৪ নভেম্বর রাজনীতি বিষয়ে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ লেখেন, ‘পাল্টে দিন দেশের রাজনীতি।’
২০১১ সালের ৪ নভেম্বর দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির করুণ দশার প্রেক্ষাপটে আইরিন খান লেখেন, ‘আর নীরব থাকা উচিত নয়।’ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম লেখেন, ‘বাংলাদেশ বসন্তের অপেক্ষায়।’ যে অপেক্ষা হয়তো ২০২৪ সালে পূর্ণতা পেয়েছে। আর মুহাম্মদ ইউনূস সেই ২০১১ সালেই প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবসে লেখেন, ‘তরুণরাই এগিয়ে থাকবে।’
ওই সময়ে প্রথম আলোর একটা প্রতিপাদ্য ছিল: ‘আসুন, দেশকে মায়ের মতো ভালোবাসি’।
২০১২ সালে আমরা দেখি, সারা পৃথিবীর ১৯৮টি দেশ থেকে অনলাইনে প্রথম আলো পড়া হয়। বিষয়টি বিবেচনা করে প্রথম আলোর স্লোগান হয়: ‘বিশ্বজুড়ে বাংলা, বিশ্বজুড়ে প্রথম আলো।’
২০১৩ সালে প্রথম আলো আবারও আস্থা রাখে তরুণদের ওপর। বাংলাদেশের কর্মজীবী নারী-পুরুষ, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে ছাত্রদের ওপর। আমরা বলি, ‘যত দিন তোমার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।’ এই ‘তুমি’ শব্দটি ছিল বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের, তরুণ-যুবকদের, ছিল কৃষক এবং শ্রমিকদের। প্রবীণদের ওপর নয়, নতুনদের ওপরই ভরসা রাখতে হবে, এইটাই ছিল প্রথম আলোর আহ্বান।
তরুণরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারবে কেবল তরুণ নেতৃত্ব। সেই বিবেচনা থেকে ২০১৪ সালে প্রথম আলো স্লোগান নেয়, ‘কালকের পৃথিবীটা আমাদের হবে।’ ২০১৫ সালে এসে প্রথম আলো বলে, ‘ধন্যবাদ, ৫৫ লাখ পাঠক’। কারণ, ওই সময় ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে থেকে জানা গেল, রোজ ৫৫ লাখ মানুষ পড়েন প্রথম আলো।
২০১৬ সালে প্রথম আলোর ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তরুণদের ওপর আস্থা আরও স্পষ্ট করা হয়। বলা হয়, ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আঠারো বছর বয়স