ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য কত দিন রোদে থাকা উচিত
একুশ শতকের শুরুতে, বিদেশে চিকিৎসা করিয়ে আসা রোগীরা বলতেন, বাংলাদেশে এতো পরীক্ষা করা হলেও আমার রক্তে ভিটামিন ডি কম এটা কেউ বুঝতে পারেনি।
তবে আমেরিকান ও ইউরোপীয় এন্ডোক্রাইন সোসাইটিগুলো একমত যে, প্রয়োজন না হলে সবার ভিটামিন ডি পরীক্ষা করার কোনো দরকার নেই। কিন্তু এই ব্যয়বহুল পরীক্ষাটি এখন রুটিন পরীক্ষার মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বুঝে রাখাও জরুরি যে, ভিটামিন ডি কোনো রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নয়।
যারা খালি গায়ে নদী পার হন বা মাঠে কাজ করেন, তাদের খাবারের পুষ্টিমান সবসময় ঠিক থাকে না, কিন্তু ভিটামিন ডি পরীক্ষা করলে রক্তে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। কারণ ভিটামিন ডি-এর আরেক নাম হলো ‘সানশাইন ভিটামিন’। যখন সূর্যের আলো আমাদের ত্বকে পড়ে, তখন ত্বকে জমা কোলেস্টেরল থেকে ভিটামিন ডি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপন্ন হয়। এরপরে এটি রক্তে মিশে যায় এবং লিভার ও কিডনিতে অ্যাক্টিভ ভিটামিন ডিতে পরিণত হয়। অর্থাৎ এটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শরীরে এর কাজ হলো রক্তের ক্যালসিয়াম শোষণ ও এর পরিমাণ ঠিক রাখা, হাড় শক্তিশালী ও দৃঢ় রাখা, পেশির শক্তি বজায় রাখা এবং কিছু কিছু রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা তৈরি করা। ভিটামিন হলেও এর বিভিন্ন বিপাকীয় প্রভাব রয়েছে, যার জন্য ডি-কে এখন একটি হরমোন বলা হয়।
সূর্যের আলোতে আল্ট্রাভায়োলেট বা অতিবেগুনি রশ্মি থাকে, যা ভিটামিন ডি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ বেশি থাকলে ভিটামিন ডি কম উৎপন্ন হয়। মেলানিন হলো প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন, যা আমাদেরকে অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে। এটি বর্মের মতো কাজ করে। সাদা ত্বকের চেয়ে কালো ত্বকে (ডার্ক স্ক্রিন) মেলানিন বেশি থাকে, তাই কালো ত্বকে ভিটামিন ডি উৎপাদন কম হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতে, সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টার মধ্যে সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিন ১০ থেকে ৩০ মিনিট সারা গায়ে রোদ লাগালে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। শরীর ঢেকে রাখলে বা সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে এই ভিটামিন ডি উৎপাদন কমে যায়। শিশু এবং বয়স্কদের ভিটামিন ডি একটু বেশি প্রয়োজন, অন্যদের প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ ইউনিট প্রয়োজন।
রিকেট একটি হাড়ের রোগ, যার সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। এটি শিশুদের হাড়ের এক ধরনের রোগ। এতে শিশুর হাত-পা বেঁকে যায়। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণে এই রোগ হয়। বয়স্কদের হয় অস্টিওম্যালেসিয়া। এই রোগীদের শরীরে, হাত-পা, হাড়ে ব্যথা হতে দেখা যায়। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্টিওপরোসিস বা হাড় ভঙ্গুর হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। অল্প আঘাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি শুধু হাড়ের সমস্যা এবং রোগের কারণ নয়, এর কারণে অন্যান্য জটিল সমস্যাও হতে পারে। যেমন- হার্টের সমস্যা, নানা ধরনের ক্যান্সার, বিপাকে পরিণত হওয়ার প্রবণতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি সংক্রমণ এবং অটোইমিউন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। যাদের পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি ছিল, তাদের করোনা ভাইরাস সংক্রমণের তীব্রতা কম ছিল ।
অধ্যাপক ডাঃ মোঃ ফিরোজ আমিন
বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা