যুক্তরাষ্ট্রে শিখনেতা হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ভারতের জন্য মাথাব্যথা বেড়েছে। এই মামলায় ভারতের সাবেক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা চলছে বলে অভিযোগ তুলে তাকে চেয়েছে সে দেশ।
ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করে না সরকার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি নিয়ে কূটনৈতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে।
দুটি ঘটনার সঙ্গে প্রত্যর্পণের প্রশ্ন জড়িয়ে গেছে। শেখ হাসিনা দেশে নেই। তিনি দেশ ছেড়ে স্বল্প সময়ের জন্য বেড়াতে গেলেও গত ৫ আগস্ট থেকে ভারতেই আছেন। কিন্তু এখনো তিনি ভারতের অতিথি বলে স্বীকৃত হয়নি।
মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে অপরাধীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাই বিকাশ যাদবকে এখনই যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের প্রশ্ন উঠছে না। ভারত চাইলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রকে না দিয়ে দেশে অনির্দিষ্টকাল হেফাজতে রাখতে পারে।
যদিও এই মামলায় সরকার চুপচাপ। তিনি দেশের মধ্যে আছেন কি না, থাকলেও কোথায় ও কীভাবে তা স্পষ্ট করে জানায়নি সরকার। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বলেছে, তিনি এখন আর সরকারি কর্মচারী নন।
এর অর্থ কিন্তু এক সময় বিকাশ সরকারের কর্মচারী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে শিখ নেতা পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং কানাডায় হরদীপ সিং নিজ্জরকে হত্যার অভিযোগে দুটি মামলা একই চরিত্রের। ভারতের কাছে পান্নুন এবং নিজ্জর উভয়েই শিখ সন্ত্রাসবাদী হিসেবে পরিচিত। দুজনেই নিষিদ্ধ শিখ সংগঠনের নেতা। পান্নুনকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ ভারত অস্বীকার করেনি। কিন্তু কানাডার অভিযোগ সরাসরি মিথ্যা বলে দাবি করেছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল উইং'(র) কর্মকর্তা বিকাশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে মার্কিন নাগরিক পান্নুনকে হত্যার চেষ্টার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ভারতীয় দূতাবাসে দায়িত্ব পালনকারী তিনি এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন নিখিল গুপ্ত নামের একজনকে। তিনি নিয়োগ করেছিলেন এক ভাড়াটে খুনিকে। এই খুনিটি আবার যুক্তরাষ্ট্রের এক চর—’আন্ডার কভার’ এজেন্ট।
নিখিলকে গ্রেপ্তার করা হয় চেক প্রজাতন্ত্রে। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। সূত্রের খবর, তারা এবার বিকাশকে পেতে প্রত্যর্পণের দাবি জানাবে।
এই অবস্থায় কী করবে ভারত? এ নিয়ে এখনই খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না। এই আলোচনায় হাসিনার বিষয়টি পিছিয়ে গেছে। কারণ, তাকে প্রত্যর্পণ করার বিষয়ে রাজনৈতিক সমস্যাও জড়িত। কিন্তু বিকাশের বিষয়টি একেবারে আলাদা, কারণ এটি সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ সুপার পাওয়ার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাবেক কূটনীতিক বলেছেন, তিনটি বিষয়কে এক দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি এলে তা এড়ানোর অনেক উপায় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতেই আছে। ভারত কানাডার অভিযোগ অস্বীকার করতে পারছে কারণ সেই দেশে বসবাসরত শিখ সম্প্রদায়ের একাংশ ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে। বর্তমান জাস্টিন ট্রুডো সরকার তাদের সমর্থনের ওপরই টিকে আছে। এছাড়া প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সে দেশে আশ্রয় পাওয়া বহু ‘অপরাধীকে’ ভারত এখনো ফেরত পায়নি।
ওই কূটনীতিক বলেন, একই সঙ্গে মনে রাখা উচিত যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী দেশটির কাছে ভারতের অনেকখানি নমনীয় হতে হবে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা প্রত্যর্পণ চুক্তিতে দাবি মেটাতে টালবাহানার বহু উপায় রয়েছে। সম্প্রতি এক ভারতীয় সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দিল্লি পুলিশ এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে বিকাশ যাদবকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০২৪ সালের মার্চে তাকে আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। এপ্রিলে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
সময়গুলো লক্ষণীয়। পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ২০২৩ সালের মে মাসে। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারী দলের মতে, ওই সময়েই নিখিলকে সেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন বিকাশ। সেই বছরের জুনে নিখিলকে গ্রেপ্তার করা হয় চেক প্রজাতন্ত্রে। ২০২৪ সালের জুনে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। বিকাশের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে।
এই মামলার কারণেই বিকাশ যাদবকে দীর্ঘদিন ভারতে রাখা যেতে পারে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাউকে প্রত্যর্পণ করা যায় না। এছাড়া মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে সাজার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপরাধীকে বন্দী রাখা যায়। অতএব বিকাশ যাদবকে এখনই হস্তান্তরের প্রশ্ন উঠছে না। ভারত চাইলে