মার্কিন ভেলবেটে ফাঁদে পড়া নিয়ে ভারতের পুনর্বিবেচনা
হিমালয়ের পশ্চিমি সীমান্তে ভারত-চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে তাদের ১৬তম ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনকাল থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে চীনের প্রধান অভিযোগ হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশটির ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান চুক্তিবদ্ধতার ফলে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
ভারতের মার্কিনপন্থি মনোভাবকে চীন ওয়াশিংটনের ‘চীন অবরুদ্ধকরণ’ নীতির সম্প্রসারণ হিসেবে দেখে। এর প্রত্যুত্তরে, ভারতকে চাপে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠতা থেকে দূরে রাখতে প্রয়াসী হয়েছে চীন।
২০১৬ সালের আগস্টে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে লজিস্টিক এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব অ্যাগ্রিমেন্টে স্বাক্ষর করে। এর সাড়া হিসেবে চীন ভারতের ওপর চাপ বাড়ায় এবং ভুটান, চীন ও ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন ডোকলামে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
উত্তেজনা কমায়ার জন্য ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর বেইজিং সফর করেন। তিনি চীনের নেতৃত্বকে আশ্বস্ত করেন যে সমস্যা সমাধানে ভারত গুরুত্ব সহকারে কাজ করবে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে চীনের উহানে মোদি ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে প্রথম অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই নেতা তাদের মতপার্থক্য দূর করতে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।
তবে উহান সম্মেলনে দেয়া প্রতিশ্রুতি কিছু দিন পরই ভেঙ্গে ফেলে ভারত, এবং সেই বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তারা আরেকটি প্রধান চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর বিষয়বস্তু ছিল যোগাযোগ ও তথ্য নিরাপত্তা।
তামিলনাড়ুর মহাবলিপুরমে মোদি ও শি দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজন করেন। তবে বৈঠকটি শীর্ষ সম্মেলন হিসেবে ব্যর্থ বলেই মনে করা হয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বৈঠকটির আগে মোদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরও কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে যে কারণে সম্ভবত সম্মেলনটি কার্যকর হয়নি।
মহাবলিপুরম সম্মেলনের পর নেপালের কাঠমান্ডুতে এক সরকারি সফরে শি সতর্ক করে বলেন, “যদি কেউ চীনকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে, তাহলে তার হাড়মাংস চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।”
এর মধ্যেই ২০২০ সালের জুনে গালওয়ানে চীন ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। উহান সম্মেলনে মোদির দেয়া প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে এগিয়ে চলে। সেই বছরের অক্টোবরে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চতুর্থ প্রধান চুক্তিটি স্বাক্ষর করে।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মোদি বিশ্বাস করতেন যে তিনি মার্কিন বাজারে ভারতের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারবেন। তিনি মার্কিন সফরকালে এমনকি ট্রাম্পের পক্ষে সরাসরি প্রচারও চালান।
তবে এত কিছুর পরেও ভারতে মার্কিন বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। এর পরিবর্তে, চীনের ওপর ভারতের বাণিজ্যিক নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ভূরাজনৈতিক দিক দিয়েও ভারতের পিছু হটেছে। ঐতিহ্যগতভাবে, দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ভারত নিজের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু আমেরিকান মিত্র হওয়ার পর ভারতের কোন প্রতিবেশী দেশই তার অধীনে থাকছে না। বরং ভারত আরও দৃঢ়ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত মিত্রে পরিণত হয়েছে।
২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মেয়াদে আসার পর মোদি এস জয়শঙ্করকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি আশা করেছিলেন যে জয়শঙ্করের আমেরিকাপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি মার্কিন বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি আকর্ষণে সহায়ক হবে। সেই সাথে, আমেরিকান বাজারে ভারতীয় পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক সুযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবর্তে, ফোর্ড, জেনারেল মোটরস এবং হার্লে-ডেভিডসন-এর মতো বড় আমেরিকান সংস্থাগুলি এই সময়ের মধ্যে ভারতীয় বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাশার মতো হয়নি।
ভারত বুঝতে পারছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশা করে ভারত “কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা” বজায় রাখবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নিজস্ব প্রভাব খাটাতে দেয়া ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন, “আমেরিকার শত্রু হওয়া বিপদজনক হতে পারে, কিন্তু তার বন্ধু হওয়া ভয়াবহ।” কথাগ