• সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন |

কালীসোনা চ্যানেলের খোঁজখবর

আজ রাত তিনটা। পাশে কামরার মুতাসিম দরজা ঠেলে ভেতরে এল। হাতে দুটি বিশাল কফি মগ, ‘সিমন ভাই, কফি নিন।’ বাহরাইনি ছোট ভাই মুতাসিম কফি দিতে দিতে বলল। আমি গনগন করে বললাম, ‘এটা কী তুমি কফি বলছ না গাওয়া?’ এদের দেশের এই জঘন্য স্বাদের পানীয়টাকে তো খাওয়াই যায় না। কীভাবে এরা এগুলো মজা করে খায়?’ হো হো করে হেসে উঠল মুতাসিম, ‘না, এটা নেসলে কফি। তবে আপনার রুমমেট চিলি (শেলী) ভাইকে কাওয়া কাওয়াবো!’ মুতাসিম এখন থার্ড ইয়ারে, আমি ফিফথ ইয়ারে। সে প্রায়ই রাত চারটা পর্যন্ত জেগে থাকে। কখনো কখনো আমাদের কামরায় এসে খোঁজখবর নেয়, কথা বলে। এই বিশালদেহী বাহরাইনি যুবকটা একটু একা একা। সে তাদের ব্যাচের একমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের ছাত্র। আরবি ভাষী ছাত্র হিসেবে প্রথমদিকে সে না বাংলা না ইংরেজি কোনো কিছুই বুঝত না। আর এ জন্য সহপাঠী ও সিনিয়ররা তার সঙ্গে মজা করত। ডাইনিংয়ের বান্দে আলী-হক মিয়ারাও সুযোগ নিত। পড়াশোনার ক্ষেত্রে সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে লাগল। কোনোমতে ঠেলেঠুলে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর পড়াশোনা প্রায় ছাড়ার মতো অবস্থা তার। এদিক দিয়ে আলাদা নেপালি- ইন্ডিয়ান-পাকিস্তানি ছাত্ররা। তারা এসেই তাদের দেশী ভাইবোনদের পেয়ে যায় এবং চলমান ভাষায় মিশে যেতেই তাদের অসুবিধা হয় না।

‘আপনাদের প্রফেসরের ডেট দিয়েছে? জানেন?’ জিজ্ঞেস করল মুতাসিম। এজন্যই তো আজ ঢাকা থেকে ছুটে আসতে হলো। অবস্থা টাইট! আমি বললাম। হাতে মাত্র ৩৫ দিনের মতো সময় আছে। আব্বা-আম্মার দোয়া নিতে ঢাকায় গিয়েছিলাম। এই সুযোগে এক বন্ধু ফোন করে জানাল, পরীক্ষার রাফ ডেট দিয়েছে, জোরকদমে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, বেতালা হলেই ডাব্বা!

মুতাসিমদের এই গাওয়া পানীয়টা তাদের মধ্যপ্রাচ্য—ইরান ও কাশ্মীরের খুব পছন্দের পানীয়। দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের পান খাওয়ার সাদা পাতার মতো। চায়ের বিকল্প হিসেবে গরম পানিতে দিয়ে দুধ-চিনি ছাড়াই পান করে। গন্ধ ভালো না, খেতেও ভালো না। কিছুদিন আগে আমাদের তিন রুমমেটকে গাওয়া পানের দাওয়াত দিয়েছিলাম। এর রং-গন্ধ দেখে আমার দুই রুমমেট কাজ আছে বলে পালাল। আমি ভদ্রতা করে আধা কাপ খেয়ে নিয়েছিলাম। এরপর থেকে আর খাওয়ার সাহস পাইনি!

আজ এখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দশটা বেজে গেছে। তিস্তা সকাল সাড়ে সাতটার ট্রেনে করে ছেড়েছিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সময়মতো ময়মনসিংহ, জামালপুর পার হয়ে দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাটে পৌঁছানোর পর থেকেই আমার ফোনে প্রচুর ফেসবুক নোটিফিকেশন আসছে। সম্ভবত এই রুট এখন থেকে বেশি হলে এক বছরই থাকবে। ইন ফুল সুইংয়ে যমুনা ব্রিজের কাজ চলছে। আমার অনেক বন্ধু প্রায় সম্পন্ন হওয়া যমুনা ব্রিজ দেখে এসেছে। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত একটানা ট্রেনে কীভাবে সময় কাটাই, এটা আমার ছোট ভাই ইমন প্রায়ই জানতে চায়। এই পথের বৈচিত্র্যের জন্য বোরিং লাগে না। সঙ্গে ক্লাসমেটদের অনেকেই থাকে। জয়দেবপুর পার হওয়ার পর আস্তে আস্তে শালবন শুরু হয়। খুব সুন্দর। আবার ময়মনসিংহের কাছাকাছি প্রকৃতি অন্যরকম। এখানে রেললাইন ঠিক ভূমির সমতলে একটানা চলে গেছে; মাঝে মাঝে ডোবা-নালা থাকলেও রেললাইনের উচ্চতা বাড়ে না; কিন্তু আমাদের কালীগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে রেললাইন ভূমি থেকে বেশ উঁচুতে। জামালপুরের কাছাকাছি থেকে শুরু হয় আখখেত, পানখেত। পানের বরজ সম্পর্কে আইডিয়া না থাকলে কেউ বলবে খেতের মাঝখানে মাঝে মাঝে শোলা (পাটকাঠি) দিয়ে বিশাল বিশাল ঘর কেন বানিয়ে রেখেছে? পান চাষে অতিরিক্ত রোদ ক্ষতিকর। জামালপুর পার হলেই মাটির পরিবর্তে চারপাশে শুধু বালু আর বালু। এলাকাটি খুবই ভাঙনপ্রবণ। প্রতিবারই দেখি, ঢাকা থেকে আসার সময় বা যাওয়ার সময় রেললাইনগুলো উঠানো-নামানো হচ্ছে, বসানো হচ্ছে। ঘাটও প্রায়ই চেঞ্জ করতে হয়। এই স্মৃতি কাতর এলাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর দেড়টা থেকে পৌনে দুইটা বেজে যেত। ঘাটে অসংখ্য বেড়ার হোটেল। প্রধান আইটেম মসলার গম্বুজের ওপর আস্ত ডিমের ভুনা বা বিরাট চিংড়ি ভাজা। ডাল ও অন্যান্য মাছের ব্যবস্থাও ছিল। গরম গরম ভাতের সঙ্গে দোকানিরা চাইতেন, খদ্দেররা চিংড়ি ভাজা বা ডিমের ভুনা নিবেন। যাত্রীরা মসলাগুলো ভাতের সঙ্গে মাখিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া শুরু করত। রেল পৌঁছানোর পর যাত্রীরা ঘাটে দাঁড়ানো স্টিমারে উঠবে। স্টিমার এখান


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *