একজন ক্রীড়ানুরাগী হিসেবে আমার সবসময়ই ভরা গ্যালারীতে ঢাকা ডার্বি উপভোগ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাস্তবতাটা হচ্ছে, আমার ফুটবল দেখার শুরুর দিকেই ঢাকা ডার্বি আবেদন হারাতে বসেছিল। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে আবাহনী-মোহামেডানের কয়েকটা ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়েছিল, কিন্তু দর্শকের অভাবে গ্যালারি প্রায় ফাঁকা ছিল।
আমার খেলা দেখার দেড় যুগেরও বেশি সময়ের মধ্যে একবারই শুধু ঢাকা ডার্বির উন্মাদনা দেখার সুযোগ হয়েছিল। সত্তর-আশি ও নব্বইয়ের দশকের স্বর্ণযুগ শেষ হওয়ার পর আবার ২০১৯ সালে ঢাকা ডার্বি তার উত্তেজনা ফিরে পেয়েছিল। ‘কোটি টাকার সুপার কাপ’ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ সুপার কাপের প্রথম আসরের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডান। ফাইনালের দিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে জায়গা পেতে হিমশিম খেতে হয়েছিল। ৩৬ হাজার ধারণক্ষমতা স্টেডিয়ামে ৪৪ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিল ম্যাচটি দেখতে। দুর্ভাগ্যবশত বয়সের কারণে এবং ঢাকায় না থাকায় ম্যাচটা গ্যালারিতে বসে দেখার সুযোগ হয়নি আমার।
যদিও, ওই ডার্বির উত্তেজনা ঢাকা ডার্বির আগের আমেজকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। আসলে ততদিনে শুধু ঢাকা ডার্বিই নয়, দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তাও যে অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছিল!
১৯২০ সালের ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সুরেশচন্দ্র চৌধুরীসহ প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যান্য সদস্যরা পূর্ববঙ্গের ছিলেন। সেই কারণে এবং ক্লাবটি পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লোকদের প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে ওঠার কারণে ইস্টবেঙ্গলকে বলা হয় বাঙালদের ক্লাব। অন্যদিকে, ১৮৮৯ সালের ১৫ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত মোহনবাগান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ভূপেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এবং ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় লোকদের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে মোহনবাগান। সেই জন্য মোহনবাগানকে বলা হয় ঘটিদের ক্লাব।
আগের দিন থেকেই টিকেট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন লেগে যেত। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের টিকেট কাউন্টার থেকে সেই লাইন বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যেত। ম্যাচের দিন দুপুর থেকেই সমর্থকরা মাঠের দিকে আসতে শুরু করত। খেলার সময় গ্যালারির দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি আর দাঙ্গাও দেখা যেত। এমনকি ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও স্টেডিয়ামের বাইরে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হতো।
কালের পরিক্রমায় বর্তমানে ঢাকা ডার্বি রং হারিয়ে ফিকে হয়ে গেলেও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় এখনও জেল্লা ধরে রেখেছে কলকাতা ডার্বি। এশিয়া মহাদেশের অন্যতম পুরনো এই ডার্বিতে অংশ নেয় মহাদেশটির সপ্তম সর্বোচ্চ পুরনো ফুটবল ক্লাব ইস্টবেঙ্গল ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরনো ফুটবল ক্লাব মোহনবাগান। কলকাতায় ইস্টবেঙ্গলকে বলা হয় বাঙালদের ক্লাব আর মোহনবাগানকে বলা হয় ঘটিদের ক্লাব।
কলকাতায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে ‘লাল-হলুদ ব্রিগেড’ এবং মোহনবাগান ক্লাবকে ‘সবুজ-মেরুন ব্রিগেড’ নামেও সম্বোধন করা হয়। ইস্টবেঙ্গলকে ‘লাল-হলুদ বিগ্রেড’ ও মোহনবাগানকে ‘সবুজ-মেরুন ব্রিগেড’ বলা হয় তাদের ঐতিহ্যবাহী লোগো ও জার্সির রঙগুলোর সঙ্গে মিল রেখে। লাল-হলুদ রঙ দুটি ইস্টবেঙ্গলের শক্তি, উজ্জ্বলতা ও একাত্মতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে লাল রং শক্তি ও সাহসের প্রতীক হিসেবে এবং হলুদ রং উজ্জ্বলতা ও আনন্দের প্রতীক হিসেবে গণ্য। অন্যদিকে সবুজ রং সাধারণত নতুনত্ব, আশা ও শক্তির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, যা মোহনবাগানের তারুণ্য ও উদ্দীপনাকে প্রকাশ করে। আর মেরুন রং গৌরব, মর্যাদা ও ঐতিহ্যের প্রতীক, যা মোহনবাগানের দীর্ঘ এবং গৌরবময় ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে।
একইসঙ্গে মোহনবাগানকে ‘মেরিনার্স’ নামেও ডাকা হয়, কারণ এটি ক্লাবের শক্তি ও অদম্যতাকে প্রতিফলিত করে, ঠিক যেমন একজন নাবিক সমুদ্রের প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়েও নিজের জায়গায় অবিচল থাকেন। তা ছাড়া মোহনবাগানের লোগোতেও একটি পালতোলা নৌকা রয়েছে, যা তাঁদের ‘মেরিনার্স’ নামে পরিচিত হওয়ার একটি প্রতীকী কারণ।
এই দুই ক্লাবের সমর্থকদের আবার বিদ্রুপাত্মক দুটো নাম রয়েছে। বিদ্রুপ করে মোহনবাগান সমর্থকদের ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা ‘মাচা’ এবং ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মোহনবাগান সমর্থকেরা ‘লোটা’ বলে থাকেন। ধারণা করা হয়, বাঙালদের খাদ্য ‘লোটে’ বা ‘লইট্টা’ থেকে ‘লোটা’ এবং মোহনবাগানের লোগো পালতোলা নৌ