পুলিশ সংস্কার: গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি
গত দুই দশক ধরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনগণের ক্ষোভ ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার একটি পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। ড. এম. এ. সোবহান পুলিশ সংস্কারের জন্য বিবেচনা করা কিছু বিষয় নিয়ে তুলে ধরেছেন:
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পুলিশ প্রাচীন মিসরী সভ্যতায় প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট এবং তাদের কর্মকাণ্ড সেই সময় অস্তিত্ব ছিল। আধুনিক যুগে পুলিশের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাই পুলিশের সমস্যা, সীমাবদ্ধতা, ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে একটি বাস্তবধর্মী এবং টেকসই পুলিশ সংস্কারের পথে হাঁটা দরকার।
আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
পুলিশকে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। পুরানো আইনগুলি হালনাগাদ করার মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
সরকার, রাজনৈতিক দল এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলি তাদের স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করেছে এবং অতীতে ব্যবহার করেছে। পুলিশকে এই ধরনের অপপ্রয়োগ থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে আরও স্বায়ত্তশাসিত, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে তোলা দরকার।
জনবান্ধব পুলিশ
পুলিশকে জনবান্ধব হতে হবে। এ জন্য তাদের জনগণের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে হবে এবং তাদের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে হবে। এটি করা যাবে কাজ, সেবা এবং ভালোবাসার মাধ্যমে। পুলিশ কর্মকর্তাদের সব দল, মত, ধর্ম এবং বর্ণের মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং এ লক্ষ্যে কার্যকর হতে পারে।
শক্তি প্রয়োগ, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা
শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশকে জাতিসংঘের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে শক্তির সর্বনিম্ন ব্যবহার, আনুপাতিক শক্তি প্রয়োগ এবং যৌক্তিক বা আইনসম্মত পদ্ধতিতে শক্তি প্রয়োগ। এই শক্তি প্রয়োগের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগকারী ব্যক্তিরা নয়, পরিকল্পনাকারীরা, কমান্ডার বা নির্দেশদাতারা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারীরাও এই দায় এড়াতে পারবেন না।
দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এর থেকে মুক্তির জন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলি এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ এবং বহিঃস্থ তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশ পুলিশের সকল সদস্যকে নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে রয়েছে পুলিশিং কৌশলের আধুনিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির প্রবর্তন, মানবাধিকার, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার অপরাধ, মাদকাসক্তি এবং মাদক পাচার। ব্যক্তিত্ব এবং সম্মান, প্রেরণা এবং প্রেষণা, জনগণের মনস্তত্ত্ব, গণজমায়েত ব্যবস্থাপনা, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, আবেগগত বা মানসিক বুদ্ধিমত্তা, শৃঙ্খলা, সততা এবং সত্যবাদিতা, সংহতি, বন্ধন ও ঐক্য, নিজের ইউনিট এবং বিভাগের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের মানুষ ও দেশের প্রতি ভালোবাসাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ক্যারিয়ার প্ল্যানিং
পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি, পদায়ন এবং প্রশিক্ষণের একটি নীতিমালা থাকতে হবে। নীতিমালাটি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। তাহলে পদোন্নতি বা পদায়ন নিয়ে কারও সুযোগ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
পুলিশ সদস্যদের মারণাস্ত্র বহন
পুলিশের কাছে মারণাস্ত্র রাখা দরকার। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, পুলিশের ‘ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার’ অধিকার আছে। দ্বিতীয়ত, অপরাধ নিবারণে প্রতিরোধক বা ‘ডিটারেন্ট’ হিসেবে এবং সন্ত্রাস দমন করতে কাজ করে।
সাধারণ মানুষের মতো পুলিশ সদস্যদেরও ‘ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার’ অধিকার আছে এবং পুলিশ আইনসম্মতভাবে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে অস্ত্র রাখা দরকার। অপরাধ নিবারণে প্রতিরোধক বা ‘ডিটারেন্ট’ হিসেবে অস্ত্র বা বড় আগ্নেয়াস্ত্র কাজ করে।
বর্তমানে সন্ত্রাস দমনে পুলিশকে অনেক শক্তি, সময় এবং অর্থ ব্যয় করতে হয়। সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ; এ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং অপরাধের জন্য মামলা নেওয়া হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে বিচার করে জেলে পাঠানো হয় এবং সবশেষে কারাগারে রেখে সংশোধনের চেষ্টা করা হয়।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ বা ‘যুদ্ধ মডেল’; এ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দ