গার্মেন্টস সরবরাহের হিসাবে গরমিল উদঘাটন
গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করে প্রকৃত পণ্য রপ্তানির ভিত্তিতে লেনদেনের হিসাব প্রকাশ করা শুরু করেছে। এর ফলে পণ্য সরবরাহের হিসাবে বড় ধরনের গরমিলের তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে পর্যন্ত, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি হিসাব প্রকাশ করে আসছিল। কিন্তু এসব হিসাব অনুযায়ী আয় দেশে আসছিল না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে এতো পণ্য সরবরাহ করা হয়নি। তাই এতো বেশি আয়ের যৌক্তিকতাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর আগে, পণ্য সরবরাহের হিসাবে গরমিলের বিষয়টি উঠে আসার কারণে, বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক, অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চে ১ হাজার ৩৮১ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যমানের গার্মেন্টস সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু কাঁচামাল আমদানির মূল্য ছিল মাত্র ৩৮৪ কোটি ডলার। তখন প্রকৃত গার্মেন্টস সরবরাহ হয়েছিল ৯৯৭ কোটি ডলার, অর্থাৎ রপ্তানি আয়ের ৭২ দশমিক ২০ শতাংশ।
তবে, পণ্য সরবরাহের তথ্য সংশোধনের পর প্রকৃত গার্মেন্টস সরবরাহ কমে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কাঁচামাল আমদানির তথ্য সঠিক থাকলেও, পণ্য রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে গার্মেন্টস খাতের প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪০৮ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ দুটি ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে প্রকৃত গার্মেন্টস রপ্তানিতে গরমিলের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এতে দেখা যায়, সরবরাহের তথ্য সংশোধন করায়, গত দুই অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪, গার্মেন্টস খাতের প্রকৃত রপ্তানি কমেছে। মূলত, গার্মেন্টস রপ্তানি থেকে তুলা, সুতা, কাপড় এবং সরঞ্জাম আমদানির ব্যয় বাদ দিয়ে নিট বা প্রকৃত রপ্তানির হিসাব করা হয়। অনেকে আবার প্রকৃত রপ্তানি আয়কে গার্মেন্টস খাতের মূল্য সঞ্চয়ন হিসেবেও অভিহিত করে থাকে।
গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক, অর্থাৎ অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে, রপ্তানি আয় বাড়িয়ে দেখানোর জন্য গার্মেন্টস রপ্তানিতে মূল্য সঞ্চয়ন এক লাফে ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এর পরের পাঁচটি প্রান্তিকে, মূল্য সঞ্চয়ন ৭০ থেকে ৭২ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। তখন অনেক গার্মেন্টস শিল্পপতিই এই বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কারণ, তার আগের ছয়টি প্রান্তিকে গার্মেন্টস রপ্তানির মূল্য সঞ্চয়ন বেশিরভাগ সময়ই ৫১ থেকে ৫৭ শতাংশের মধ্যে ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিক, অর্থাৎ এপ্রিল-জুন মাসে ৮৮৪ কোটি ডলারের গার্মেন্টস সরবরাহ করা হয়েছে। ওই প্রান্তিকে কাঁচামাল আমদানির মূল্য ছিল ৩৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, সর্বশেষ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে গার্মেন্টস রপ্তানির মূল্য সঞ্চয়ন ছিল ৫০৪ কোটি ডলার, অর্থাৎ ৫৭ শতাংশ।
আগামীতে মূল্য সঞ্চয়ন কমবে বলে আমাদের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, প্রণোদনা কমে যাওয়ার পর, অনেক ব্যবসায়ী এখন সুতা আমদানির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। কারণ, প্রতি কেজি বিদেশি সুতা ব্যবহার করলে ২০-৩০ সেন্ট কম খরচ হচ্ছে। এছাড়া, গ্যাস সংকটের কারণেও অনেক উদ্যোক্তা সুতা এবং কাপড় আমদানিতে মনোযোগ দিচ্ছেন।—মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি, বিকেএমইএ।
পণ্য সরবরাহের হিসাবে গরমিলের বিষয়টি সামনে আসার আগে ইপিবি জানিয়েছিল, আগের অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে ৫ হাজার ১৫৪ কোটি ডলার। কিন্তু চলতি অক্টোবর মাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, আগের অর্থবছরে পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ, আগের অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই ইপিবি ৭০৭ কোটি ডলারের সরবরাহ বেশি দেখিয়েছিল। একইভাবে, গার্মেন্টস রপ্তানির হিসাবও বেশি দেখানো হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৩ হাজার ৬১৩ কোটি ডলারের গার্মেন্টস রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ কম। আলোচ্য অর্থবছরে, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি গার্মেন্টস রপ্তানি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যার মূল্য ৬৬২ কোটি ডলার। এছাড়া জার্মানিতে ৪৫২ কোটি, যুক্তরাজ্যে ৪২০ কোটি, স্পেনে ৩৩৮ কোটি এবং ফ্রান্সে ২০২ কোটি ডলারের গার্মেন্টস রপ্তানি করা হয়েছে।